হিমালয়, আন্দিজ, আল্পস, রকি ইত্যাদি নামে পাহাড়-পর্বতের নাম শুনেছেন কিন্তু এমনকি কখনো শুনেছেন পাহাড়ের নাম ‘চকলেট পাহাড়’? এমনই পাহাড় রয়েছে ফিলিপাইনের বোহোল (Bohol) দ্বীপে। বিস্তীর্ণ সবুজ সমতলের মাঝখানে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা গম্বুজাকৃতির এই পাহাড়গুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন অসংখ্য চকলেট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে এক হাজার দুই শতাধিক ছোট-বড় পাহাড় রয়েছে। বর্ষাকালে পাহাড়গুলো সবুজ ঘাসে ঢাকা থাকে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেই ঘাস শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করলে পুরো এলাকাটি দেখতে চকলেটের মতো হয়ে যায়। এ কারণেই এর নাম হয়েছে চকলেট হিলস।
এই পাহাড়গুলোর আকৃতি প্রায় একই ধরনের, গোল ও মসৃণ গম্বুজের মতো। অধিকাংশ পাহাড়ের উচ্চতা ৩০ থেকে ৫০ মিটার হলেও কিছু পাহাড় প্রায় একশ মিটার পর্যন্ত উঁচু। এত বিপুলসংখ্যক সমান আকৃতির পাহাড় পাশাপাশি অবস্থান করায় এ স্থানটি পৃথিবীর অন্য অনেক প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকে আলাদা। পাহাড়গুলোর মাঝখানে সবুজ প্রান্তর ও ছোট গাছপালা পুরো পরিবেশকে আরও মনোরম করে তোলে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বহু হাজার বছর আগে এ অঞ্চল সমুদ্রের নিচে ছিল। সমুদ্রের তলদেশে জমে থাকা চুনাপাথর ধীরে ধীরে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে। এরপর দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি, বাতাস ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের প্রভাবে সেই চুনাপাথরের স্তরগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গম্বুজাকৃতির পাহাড়ে রূপ নেয়। প্রকৃতির দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল প্রক্রিয়ার ফলেই আজকের এই অনন্য ভূদৃশ্য তৈরি হয়েছে।
চকলেট হিলস এখন ফিলিপাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ। প্রতি বছর অসংখ্য দেশিবিদেশি ভ্রমণকারী এখানে এসে এই অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করেন। পাহাড়ের ওপর নির্মিত পর্যবেক্ষণ স্থান থেকে তাকালে দিগন্তজোড়া গম্বুজাকৃতির পাহাড়ের সারি চোখে পড়ে, যা এক অনন্য সৌন্দর্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এই দৃশ্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।
এই পাহাড়গুলো ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিভিন্ন লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেন, দুই দৈত্যের যুদ্ধের ফলে এই পাহাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। আবার কেউ বলেন, এক দৈত্যের অশ্রু শুকিয়ে এই টিলাগুলো তৈরি হয়েছে। বাস্তবে এগুলো প্রকৃতির দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল হলেও এসব গল্প এই স্থানকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টির উদাহরণ হিসেবে চকলেট হিলস শুধু ফিলিপাইনের গর্ব নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবেও পরিচিত। এর সৌন্দর্য একবার দেখলে যে কারও মনে গভীর ছাপ ফেলে।
লেখক : পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়