মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়াজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের জেরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় অনেক দেশ আবারও সবচেয়ে দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লার দিকে ঝুঁকছে। এতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনা স্থগিত করেছে এবং কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমা তুলে নিয়েছে। থাইল্যান্ড তাদের বৃহত্তম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়েছে। ফিলিপাইন সরকার ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, যেখানে মোট বিদ্যুতের প্রায় ৭৫ শতাংশই কয়লা থেকে উৎপাদিত হয়, সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও মার্চ মাসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কয়লা আমদানি বেড়েছে। গ্রীষ্মকালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের মূল কারণ এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকছে। বিশ্বের মোট এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়, সেটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কাতারের একটি বড় এলএনজি রপ্তানি স্থাপনায় হামলার কারণে সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অঞ্চলের অনেক দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সার উৎপাদনের মতো শিল্পের জন্যও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আগামী ২৫ বছরে এশিয়ায় এর চাহিদা দ্বিগুণ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এলএনজিকে কেন্দ্র করেই অনেক দেশ জ্বালানি খাত সাজিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ তাদের বিপদে ঠেলে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ঘনমিটার এলএনজি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ কমেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। বিশ্ব জ্বালানি বাজার মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত অবস্থা থেকে তীব্র ঘাটতিতে চলে গেছে। এর ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রকৃত ঘাটতির ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশের নিজস্ব কয়লা মজুত রয়েছে, তারা দ্রুত সেটির ব্যবহার বাড়াচ্ছে, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও সস্তা। শিল্পোৎপাদন চালু রাখতে অনেকে বাধ্য হচ্ছে। কিছু দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, কয়লার ব্যবহার বাড়ানো জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান সংকট সরকারগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ফিরে না গিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কারণ, জীবাশ্ম জ্বালানি শুধু পরিবেশ দূষণই ঘটনায় না, এটা ব্যয়বহুল। জীবাশ্ম জ্বালানি টেকসই সমাধান নয়- একসময় শেষ হবে, প্রতিনিয়ত দাম বাড়বে, যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক নানা সংকটে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে। এজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে। ভিয়েতনামে বাসা থেকে কাজ করার উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগাম ছুটি ঘোষণা ও লোডশেডিং বাড়ানো হয়েছে। পাকিস্তানে স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশও আংশিক অনলাইন পাঠদানের দিকে ঝুঁকছে। অফিস ও ব্যাংকিং সময় কমানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েক বছরও সময় লাগতে পারে। ফলে এই জ্বালানি সংকট এবং এর প্রভাবে দূষণ বৃদ্ধির আশঙ্কা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।