অশোক গাছ আমাদের উপমহাদেশের এক অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক। বৈজ্ঞানিক নাম Saraca asoca, এই চিরসবুজ বৃক্ষটি ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে জন্মে। অশোক গাছের বিশেষত্ব হলো, এর ফুল শুধু ডালে নয়, অনেক সময় গোড়া থেকে কাণ্ডজুড়েও ফুটে ওঠে, যা একে অন্যসব গাছ থেকে আলাদা করে। বসন্ত এলেই গাছ ভরে ওঠে উজ্জ্বল কমলা-লাল ফুলে। প্রথমে হলুদাভ, পরে ধীরে ধীরে গাঢ় কমলা ও লালচে রঙে রূপ নেয়- প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে এক অপূর্ব আবেশে।
অশোক ফুলের সৌন্দর্য শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের গভীর সম্পর্ক। প্রাচীন সাহিত্য ও পুরাণে অশোককে প্রেম, আনন্দ ও নবজাগরণের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। “অশোক” শব্দের অর্থই ‘‘শোকহীন’’ যে দুঃখ দূর করে। বসন্তে এর ফুল ফোটা যেন জীবনে নতুন আশার বার্তা আনে, হৃদয়ে জাগায় উচ্ছ্বাস।
এই গাছকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য রোমান্টিক কাহিনি ও ঐতিহাসিক স্মৃতি। রামায়ণের কাহিনিতে সীতাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল অশোকবনে, যেখানে ফুলে ভরা এই গাছ তার দুঃখের মাঝেও আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আবার প্রাচীন কাব্যে বিশ্বাস করা হতো, প্রিয়জনের স্পর্শে অশোক গাছে ফুল ফোটে; যেন প্রেমই প্রকৃতির প্রাণশক্তি।
উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে অশোক ফুল প্রেম, কামনা ও উর্বরতার প্রতীক। কামদেবের ধনুকের পঞ্চশরের একটি হলো অশোক ফুল, যার আঘাতে হৃদয়ে জাগে প্রেমের উন্মাদনা। বসন্তের দূত টিয়া পাখির পিঠে চড়ে তিনি জীবজগৎকে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। বাংলা সাহিত্যে ও কবিতায়ও অশোকের এই রূপ বারবার ফিরে এসেছে। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন-
“শ্যামল তনুতে হরিত কুঞ্জে
অশোক ফুটেছে পুঞ্জে পুঞ্জে...”
বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অশোক এবং স্বর্ণ অশোক বিশেষভাবে পরিচিত, আর রাজ অশোককে বলা হয় মিয়ানমারের গর্ব। ‘দুঃখহীন’ এই বৃক্ষ নানা দেশ, নানা সংস্কৃতির গল্পকে একসূত্রে বেঁধেছে।
শুধু নান্দনিকতা বা রোমান্টিকতার জন্যই নয়, অশোক গাছের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গুণ। আয়ুর্বেদে এর ছাল ও ফুল বিশেষত নারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণাও এর কিছু উপকারিতা নির্দেশ করে। তবে দুঃখের বিষয়, নগরায়ণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এই গাছ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। গাছটিকে সংরক্ষণ করা মানে আমাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির এক মূল্যবান অংশকে ভবিষ্যতের জন্য বাঁচিয়ে রাখা।
লেখক : পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়