রাজধানীর নিকুঞ্জ-১ (দক্ষিণ) আবাসিক এলাকা ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাঝামাঝি অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়টি রক্ষা করা যাচ্ছে না। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রতিদিন অল্প অল্প করে ভরাট করা হচ্ছে স্টর্ম স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার এই প্রধান জলাধারটি। দীর্ঘদিন ধরে নিকুঞ্জ-১ ও জামতলা এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এই জলাশয়টি বিলীন হলে পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দায়ের করা ৯৪৫ নম্বর রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট জলাশয়টি ভরাটে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। একই সঙ্গে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও ভরাট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবারও জলাশয় ভরাট শুরু হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, ইতোমধ্যে ভরাট করা অংশে কয়েকটি এক তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশে ধীরে ধীরে মাটি ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর নিকুঞ্জ (দক্ষিণ) আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি নাইম আহমেদ খিলক্ষেত থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পর পুলিশ গিয়ে সাময়িকভাবে ভরাট কাজ বন্ধ করলেও কিছুদিন পর তা আবার শুরু হয়। আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০০০ সালের প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনসহ একাধিক বিধিমালায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। আইনকে আরও কঠোর করে ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশের ৪৯ ধারায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নদনদী-খালবিল বা কোনো প্রাকৃতিক জলাধারের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করলে ২ থেকে ১০ বছরের জেল এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার যখন আইন-অধ্যাদেশ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিল, তখন নিরবে মৃত্যু হচ্ছিল রাজধানীর এই জলাশয়টির, যা এখনো চলছে।
জলাশয়ে থাকা নিজের জমি ভরাট করছেন ইঞ্জিনিয়ার ফারুক। তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকি। কয়েকদিনের জন্য দেশে আসছি। জমিটি বহু বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। রাজউক কোনো প্ল্যান অনুমোদন করছে না, তাই বিক্রির চিন্তা করছি। ভরাটের বিষয়ে আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ আছে কি না আমার জানা নেই। অনেক আগে একটি মামলা হয়েছিল বলে শুনেছি, তবে আমি কোনো নোটিস পাইনি। এটি আমার ব্যক্তিগত জমি, সরকারি নয়- এ কারণে ভরাটে আইনি বাধা নেই বলেই মনে করি।”
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জলাশয়টি শুধু পরিবেশগত দিক থেকেই নয়, বরং পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জলাধারটির সঙ্গে ওয়াসার স্থাপিত স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন সংযুক্ত, যার মাধ্যমে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণ করা হয়। জলাশয়টি ভরাট হয়ে গেলে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে। বৃহত্তর জনস্বার্থে প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করে হলেও জলাধারটি সংরক্ষণ করা জরুরি।