Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:২৬

ইন্টারপোলে ওরা ২০

মির্জা মেহেদী তমাল ও সাখাওয়াত কাওসার

ইন্টারপোলে ওরা ২০

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা আরও ২০ অপরাধীকে দেশে ফেরত আনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা ৬৫ ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ অপরাধীর মধ্যে এই ২০ জনের অবস্থান শনাক্ত হয়েছে। এদের আটজন সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, দুবাই, ভারত, সুইডেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। শিগগিরই এদের দেশে ফেরত আনা হবে।

পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র এ তথ্য দিয়ে বলেছে, এই ২০ জনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, জেলহত্যা মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলা, চট্টগ্রামের ৮ খুন মামলা, নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন মামলার পলাতক আসামি ছাড়াও পুরস্কার ঘোষিত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীও রয়েছেন। ২০ জনের মধ্যে আটজন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।  সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর পার হলেও ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা আসামিরা গ্রেফতার হন না। তাদের অনেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রকাশ্য জীবনযাপন করে আসছিলেন। তাদের ব্যাপারে সরকারের কাছে খোঁজখবর থাকলেও দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি ছিল না। দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে চেষ্টা করা হলেও আইনি জটিলতা ও নানা দুর্বলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনাকে ১৭ বছর আগে হত্যার চেষ্টাকারী মুরাদকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর অন্য আসামিদের দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভারত ও থাইল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দী বিনিময় চুক্তি নেই। অন্যান্য দেশ থেকে আসামি আনতে হলে ক‚টনৈতিক চ্যানেলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অপরাধীদের দেশে ফেরত আনতে হবে। যে কারণে অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে ক‚টনৈতিক চ্যানেলেই আলাপ-আলোচনা চলছে। এ সংক্রান্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টাস্কফোর্স কাজ করছে। এ টাস্কফোর্স বিদেশে পালিয়ে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে যারা বিভিন্ন মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারের জন্য আসামি হিসেবে চিহ্নিত তাদের তালিকা প্রণয়ন করছে। এ কমিটি বিদেশে এসব আসামির অবস্থান, দেশে ফিরিয়ে আনার উপায় খুঁজে বের করাসহ সব কাজ করবে।

যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলেন, বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলায় যারা দেশ ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেরার তাদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি অপরাধীদের দেশে ফেরত এনে আইনের মুখোমুখি করতে। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এনসিবি) মাহবুবুর রহমান ভূইয়া বলেন, একজন আসামির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়াই ইন্টারপোলের কাজ। গ্রেফতারের পর তাদের দেশে ফেরত আনার বিষয়টি ক‚টনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। এ ছাড়া তাদের দেশে ফেরত আনাটা কঠিন হয়ে পড়বে।

গেল পাঁচ বছরে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ১০ অপরাধীকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আনা হয় সিলেটের রাজন হত্যা মামলার আসামি কামরুল ইসলামকে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার পলাতক আসামি নূর হোসেনকে দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে গতকালই অনুমতি পেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরত আনতে এখন আর কোনো আইনি বাধা নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, ২০১০ সালের পলাতক ৭৩ বাংলাদেশিকে ধরতে ইন্টারপোল ইনফ্রা রেড-২০১০ নামে একটি অভিযান শুরু করে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামিসহ সেই সময়কার ৭৩ জন পলাতক বাংলাদেশিকে ধরা এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ওই বছরের মে মাস থেকে ১৮৮টি দেশে যুগপৎ অভিযান শুরু করে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল)। ইনফ্রা রেড-২০১০ নামে ওই অভিযানের শুরুতে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ওই অভিযানে মূল টার্গেট ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ছয় ফেরারি আসামি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এইচ বি এম নূর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেহউদ্দিন। তাদের সবার নামে এখনো ইন্টারপোলে রেড ওয়ারেন্ট জারি রয়েছে। তবে গত বছর ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৭ বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলার অন্যতম আসামি নাজমুল মাকসুদ মুরাদকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার পর নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয়।

পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি শাখা সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, জেলহত্যা মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলা, চট্টগ্রামের আট খুন মামলা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার পলাতক আসামিসহ বিদেশে পলাতক ২০ জন আসামির অবস্থান শনাক্ত এবং গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি এ এম রশীদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে, নূর চৌধুরী কানাডায়, আবদুল মাজেদ অবস্থান করছেন ভারতে। তবে এরই মধ্যে রিসালদার মোসলেহউদ্দিন ভারতে মারা গেছেন বলে গুজব রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শরিফুল হক ডালিম, আবদুর রশীদ ও আবদুল মজিদের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ নিশ্চিত না হলেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। চার নেতা হত্যা মামলায় ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন  আনসার ও ক্যাপ্টেন (অব.) কিসমত হাশমী দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে কিসমত হাশমী কানাডায় মারা গেছেন বলে দাবি করেছে তার পরিবার। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি মাওলানা তাজউদ্দীন দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছেন।

সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার বর্তমানে সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত চৌধুরী মঈনউদ্দীন দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটেনে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত নূর হোসেন ভারতের কারাগারে বন্দী রয়েছেন। গতকাল পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালত নূর হোসেনকে ফিরিয়ে দিতে কোনো বাধা নেই বলে রায় দিয়েছেন। এর বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ এবং চট্টগ্রামের এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ হোসেন ভারতের কারাগারে বন্দী রয়েছেন বলে জানা গেছে। ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর নরসিংদীর মেয়র লোকমান হত্যা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত পলাতক মোবারক হোসেন মোবা প্রথমে মালয়েশিয়ায় এবং সর্বশেষ দুবাইতে অবস্থান করছেন। কিছু দিন আগে অবৈধভাবে বসবাসের জন্য দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। মডেল তিন্নি হত্যা মামলার অন্যতম আসামি জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি গোলাম ফারুক অভি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।

দেশে ফেরত ১০ : বিগত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা কামরুলসহ (শিশু রাজনের হত্যাকারী) ১০ জন আসামিকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা মামলার আসামি নাজমুল মাকসুদ মুরাদকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হয়। এ ছাড়াও উত্তর কোরিয়া থেকে শিমুল, আবুধাবি থেকে নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হত্যা মামলার সঙ্গে জড়িত তারেক আহমেদ, মালয়েশিয়া থেকে নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হত্যা মামলার সঙ্গে জড়িত নুরুল ইসলাম, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি আবুল কালাম ওরফে কালাম, সিঙ্গাপুর থেকে হত্যা মামলার পলাতক আসামি ফারুক হোসেন, মালয়েশিয়া থেকে রমনা থানা মসজিদের ইমাম হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি আবদুর রহিম, সৌদি আরব থেকে খুনের অপরাধে অভিযুক্ত আসামি আবু তাহের আল নূর মিয়া এবং খুনের অপরাধে অভিযুক্ত আসামি আবদুর রহিম মিয়া ওরফে গফুরকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে নিউজিল্যান্ড থেকে। এদিকে পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ইন্টারপোলের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২০১৪ সালের ১০ জুন রাজধানীর খিলগাঁও থেকে শিশু পর্নোগ্রাফিতে জড়িত থাকার অপরাধে টি আই এম ফখরুজ্জামান ওরফে টিপু কিবরিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত থাকায় গত ৩০ মার্চ ইন্টারপোলের মাধ্যমে সিলেটের বালাগঞ্জের নান্নু মিয়াকে দেশে ফেরত আনে সিআইডি। 


আপনার মন্তব্য