শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

যেন একখণ্ড সুসজ্জিত গ্রামবাংলা

মোস্তফা কাজল, গাজীপুর থেকে ফিরে

যেন একখণ্ড সুসজ্জিত গ্রামবাংলা

আবহমান গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি অনুযায়ী একখণ্ড সুসজ্জিত গ্রামবাংলা নির্মাণ করা হয়েছে গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর তৈরি হয়েছে এ গ্রাম। যেখানে তৈরি করা হয়েছে মাটির ঘর, কুঁড়ে ঘর, রান্নাঘর, টং ঘরের দোকান, গোয়ালঘর, ঢেঁকিঘর, বাথরুম, টিউবওয়েল, পাতকূয়া, সবজি খেত এবং আম বাগান। ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে বিষমুক্ত সবজি বাগানও করা  হয়েছে। প্রতিটি প্লট ভাগ করা হয়েছে আইল দিয়ে। আইলের মধ্য রয়েছে চওড়া আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। যার কিছু অংশে আবার লাল ইট বিছানো। এই গ্রামীণ পথে অন্তত ছয়বার চক্রাকারে হেঁটে গেলে এক মাইল হাঁটা হয়ে যাবে। এমন সুসজ্জিত গ্রামবাংলা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম এ মাননান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আপনার ছেলেমেয়েরা হয়তো গ্রাম দেখেনি। আমরাই বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার মডেল তৈরি করেছি।’ তিনি জানান, এখানে রয়েছে ১০০ জনের পিকনিক করার নানা আয়োজন। এখানে এসে নিজেকে আবিষ্কার করা যাবে ফ্ল্যাট কালচারের বাইরে বাঙালির চিরচেনা সংস্কৃতিকে। সরেজমিনে দেখা গেছে, এ গ্রামে রয়েছে ফুটবল খেলার মাঠ, সাইকেল চালানোর জন্য পিচঢালা সড়ক। আরও তৈরি করা হয়েছে ছোটবন ও গাছ চেনার সহজ জায়গা। এ ছাড়াও রান্না করার জন্য লাকড়ি কুড়ানো যাবে ক্যাম্পাসের ভিতর থেকেই। ছোট টিলার পাশে ও সবজি খেতে রয়েছে উন্মুক্ত পানির কল। ইচ্ছে হলেই সেরে নেওয়া যাবে গোসল এবং হাতমুখ ধোয়ার কাজ। বাঁশের বেড়ার তৈরি টিনের চালার নিচে বৈঠকখানায় রয়েছে বিশাল বারান্দা। তার ভিতরে দুটি গ্রামীণ খাট, হাতলওয়ালা চেয়ার ও কাঠের সিন্দুক— যেখানে বসে জানালা দিয়ে উপভোগ করা যাবে দিনের বেলায় দক্ষিণের ঠাণ্ডা বাতাস। আর রাতে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাবে চাঁদ মামাকে। রাতের বেলায় খাটে শুয়েও বিশ্রাম নেওয়া যাবে। বারান্দায় বসে প্রিয়জনদের সঙ্গে গল্প করাও যাবে। পাশাপাশি দূরে তাকিয়ে দেখা যাবে মেঠোপথ, সবজি বাগান, মরিচ-বেগুন আর কুমড়ার নয়ন জুড়ানো হলুদ ফুল। পেঁপে আর খেজুর গাছের দৃষ্টি নন্দন দৃশ্যও। যদি বৃষ্টি হয় টিনের চালায়, সেই শব্দে স্বপ্নিল ঠিকানায় হারিয়ে যাওয়ার পুরো ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিগন্তে তাকিয়ে আকাশ, টিলা, সবজি খেত দেখতে দেখতে এমনিতেই মন জুড়িয়ে যাবে। পাশের টং দোকান থেকে চা, ভাঁপা পিঠা কিনে এনে খাওয়া যাবে। ওখানে গিয়ে দোকানির সঙ্গে আলাপ চারিতায় মেতে ওঠা যাবে। ভালো লাগবে খেটে খাওয়া মানুষের কথা শুনতে। টং ঘরের দোকানের পাশের মাচায় বসে চা পানের আলাদা অনুভবতো আছেই। ওই মাটির ঘরের ভিতর আরও রয়েছে কাঠের চৌকি, টেবিল, শীতল পাটি ও চাল-ডাল জমিয়ে রাখার বিরাট ডোল, পুরনো স্টাইলের আলমারি। রয়েছে লম্বাটে বারান্দা। মাটির ঘর আর বৈঠকখানার মাঝে বিশাল উঠোন। ঘরের বারান্দায় বসে দেখা যায় রান্নাবান্নার দৃশ্য, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা। সরেজমিন ঘুরে বোঝা গেছে, শীতের ভোরের প্রকৃতি, কুয়াশা, অলস দুপুরের হলুদ রাঙা পাখির ছোটাছুটি অথবা বিরামহীন টিনের চালায় বৃষ্টির সংগীতের মূর্ছনা, রাতের নিস্তব্ধতা, অপূর্ব সুর-ছন্দ সত্যি সত্যিই মনে কাটবে গভীর দাগ। তাজা মাছ ভাজা, কলাপাতায় খিচুড়ি খাওয়ার মজাও এখানে সবাইকে আকৃষ্ট করবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নব সৃষ্ট গ্রাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী এস এম কেরামত আলী বলেন, ‘আমরা পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়ানোর জন্য পিঠা উৎসব, ছোট ছোট গ্রুপে পিকনিক এবং জ্যোত্স্না রাতের অনুভূতি উপভোগ করার জন্য উৎসাহী পরিবারকে অবসর সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের বাউবি পরিবার ছাড়াও যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নামমাত্র মূল্যে এই গ্রাম ও তার অবকাঠামো ভাড়া নিয়ে পারিবারিক পিকনিক অথবা সামাজিক অনুষ্ঠান করতে পারবেন। এই গ্রামে নিরাপত্তা প্রহরী, রাঁধুনি, কেয়ারটেকারসহ রয়েছে আটজনের একটি পরিচালনা কমিটি। হাতের নাগালেই পাওয়া যাবে সবকিছু।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে এই গ্রাম নীরবে আনন্দের সাথী হতে চায়। এখানে নিজেরাই রান্না করতে পারবেন। বাজার করতে পারবেন। ফিরে যাওয়ার সময় নিজেরাই ঘরবাড়ি, থালাবাটি পরিষ্কার করবেন। আপনি ও আপনার পরিবার-পরিজনসহ এখানে এসে গ্রামীণ পরিবেশে কীভাবে মানুষ পরিশ্রম করে— তা আনন্দের সঙ্গে শিখে যাবেন। এটাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।’

সর্বশেষ খবর