শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:১২

ইয়াবা বেচতে গিয়ে ধরা পড়ছে পুলিশ

জব্দ মাদক নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

ইয়াবা বেচতে গিয়ে ধরা পড়ছে পুলিশ

চট্টগ্রামে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জব্দ করা ইয়াবা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। জব্দ করা ইয়াবার সিংহভাগ নিজেদের মধ্যে রেখে বাকি অংশ দেখানো হয় জব্দ তালিকায়। পুলিশের এই রীতি দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ অবস্থায় চলমান। শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টা জানলেও ‘সোর্স মানি’র সংকটের দোহাই দিয়ে নীতিবহির্ভূত এ কাজ করে চলছে পুলিশ সদস্যরা।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)’র কমিশনার মাহবুবর রহমান বলেন, ‘জব্দ ইয়াবা নিজেদের মধ্যে ভাগ ভাটোয়ারার কোনো সুযোগ নেই। যে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হবে, তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাঝে মধ্যে কিছু পুলিশ সদস্য এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়। কেউ কেউ আবার ধরাও পড়েছে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ বাকলিয়ার থানার উপ-পরিদর্শক খন্দকার সাইফুদ্দীনের বাসা থেকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া নাজিম উদ্দিন মিল্লাতকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের ইয়াবা সম্পৃক্ততা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন মিল্লাত। জিজ্ঞাসাবাদ বিষয়ে র‌্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক মিমতানুর রহমান বলেন, ‘নগরীর বাকলিয়া থানাধীন চাক্তাই ফাঁড়িতে যে সব ইয়াবা জব্দ করত তার সিংহভাগই রেখে দিতেন উপ-পরিদর্শক সাইফুদ্দীন। পরবর্তীতে তা বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হতো। জব্দ করা ১৫ হাজার পিস ইয়াবা ছিল নিজেদের মধ্যে ভাগ ভাটোয়ারা করার পর সাইফুদ্দীনের ভাগে পড়া একটি চালানের অংশ।’

চট্টগ্রামে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ প্রতিদিনের। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে অন্যান্য সংস্থাগুলোকে যে হারে সোর্স মানি দেওয়া হয়, তার অর্ধেকও দেওয়া হয় না পুলিশকে। তাই মাদক উদ্ধার অভিযানগুলোতে অসদুপায় অবলম্বন করতে হয় পুলিশকে। মাদক উদ্ধারের পর সোর্স মানি হিসেবে তথ্যদাতাকে দিতে হয় জব্দ করা মাদকের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। বাকি মাদক থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নিজেদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করা হয়। ১০ থেকে ২০ শতাংশ মাদক জব্দ তালিকায় দেখিয়ে আসামিকে গ্রেফতার দেখানো হয়।’ তিনি বলেন, ‘জব্দ করা ইয়াবা নিজেদের মধ্যে ভাগ ভাটোয়ারা করা পুলিশের এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার ৩০ হাজার পিস ইয়াবার সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় সিএমপির পুলিশ লাইনে সংযুক্ত উপ-পরিদর্শক বদরুদ্দৌজা মাহমুদকে। ৩১ জুলাই নিজের ভাগের ১৫ হাজার পিস ইয়াবা বিক্রি করতে গিয়ে র‌্যাবের ফাঁদে আটক পড়েছেন নগরীর বাকলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক খন্দকার সাইফুদ্দীন। এ সময় সাইফুদ্দীনের ঘনিষ্ঠজন নাজিম উদ্দিন মিল্লাতকে গ্রেফতার করলেও পলাতক রয়েছেন সাইফুদ্দীন। গত ২ এপ্রিল নগরীর ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে কামরুজ্জামান কামরুল নামে এক কনস্টেবলকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ৭ মে চট্টগ্রামের বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ২২ হাজার পিস ইয়াবাসহ মো. মোস্তাকিম নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে আটক করে। কিন্তু গ্রেফতার না দেখিয়ে টাকার বিনিময় তাকে ছেড়ে দিয়ে এবং ইয়াবার চালান রেখে দেন পুলিশ সদস্যরা। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ইয়াবাসহ দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ২০১৬  সালের ২৬ নভেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা টিমের হাতে গ্রেফতার হন নগরীর বাকলিয়া থানার উপ-উপপরিদর্শক মোহাম্মদ রিদওয়ান। তার কাছ থেকে ১৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রিদওয়ান বলেন, নগরীর শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে ১৭০০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে আটক করেন তিনি। কিন্তু ইয়াবাগুলো থানায় জমা না দিয়ে তিনি নিজের কাছে রাখেন। পরে ইয়াবা বিক্রেতাকে ছেড়ে দেন। এ ইয়াবাগুলো বিক্রি করতে গিয়েই তিনি গ্রেফতার হন। ২০১৫ সালের ২৩ জুন ফেনীর লালপোল এলাকা থেকে ২৮ কোটি টাকার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় পুলিশের বিশেষ শাখার এএসআই মাহফুজুর রহমান। একই বছরের ২৪ জানুয়ারি ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন পুলিশ কনস্টেবল নাজমুল ইসলাম। একই বছরের ১৫ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফৌজদারহাট এলাকায় কোটি টাকার ইয়াবা ও নগদ ১০ লাখসহ গ্রেফতার হন এসআই আকতার ও কনস্টেবল দেলোয়ার। একই বছর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ফাসিয়াখালী এলাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন চট্টগ্রাম নগর বিশেষ শাখার কনস্টেবল বাছির আহমেদ।

ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশের এসআই গ্রেফতার : র‌্যাবের হাতে ফার্নিচার-বোঝাই মিনি ট্রাকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) বদরুদ্দোজা মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইয়াবা পাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরসরাই থানার এসআই আবুল হাসেম দুপুরে এসআই বদরুদ্দোজা মাহমুদকে গ্রেফতার দেখান। খুলশী থানা পুলিশের হেফাজত থেকে বদরুদ্দোজা মাহমুদকে গ্রেফতার করে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইরুল ইসলাম বলেন, এসআই বদরুদ্দোজা মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার ভোরে মিরসরাই থানার রেদোয়ান পেট্রল পাম্পসংলগ্ন এলাকা থেকে একটি মিনি ট্রাকসহ (ঢাকা মেট্রো-ন ১৪-১৮২৯) ট্রাকচালক মো. মোক্তার ও সহকারী মো. সবুজকে আটক করে র‌্যাব। পরে মিনি ট্রাকে থাকা ফার্নিচারের ভিতর তালাবদ্ধ করে লুকানো ২৯ হাজার ২৮৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মিরসরাই থানায় একটি মামলা করা হয় র‌্যাবের পক্ষ থেকে। ট্রাকচালক ও সহকারী ইয়াবাগুলো চট্টগ্রাম লালখান বাজার হাইলেভেল রোডের এসআই বদরুদ্দোজা মাহমুদের বাসা থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২৯ আগস্ট ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে এসআই বদরুদ্দোজার ফার্নিচার ও মালামাল চট্টগ্রামের লালখান বাজার হাইলেভেল রোডে নিয়ে আসেন ট্রাকচালক মোক্তার ও সহকারী সবুজ। পরদিন রাতে সেই ট্রাক ঢাকায় ফেরত যাওয়ার সময় এসআই বদরুদ্দোজা ট্রাকে একটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট তালাবদ্ধ করে তুলে দেন মোহাম্মদপুরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ইয়াবা উদ্ধারের পর দুজনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী র‌্যাব এসআই বদরুদ্দোজাকে আটক করে খুলশী থানায় তুলে দেয়। এসআই বদরুদ্দোজাকে এক মাস আগে সাময়িক বরখাস্ত করে ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা থেকে শাস্তিমূলক বদলি করে সিএমপিতে পাঠানো হয়। তিনি সিএমপির পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলাও রয়েছে। সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান বলেন, এসআই বদরুদ্দোজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর