Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:০১

এরশাদের পর কী হবে জাতীয় পার্টির

শফিকুল ইসলাম সোহাগ

এরশাদের পর কী হবে জাতীয় পার্টির

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবর্তমানে কী হবে জাতীয় পার্টির- এ নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে চলছে নানামুখী আলোচনা। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বার্ধক্যজনিতসহ নানা রোগে ভুগছেন। চলাফেরা করতেও এখন তার সমস্যা। এসব বিবেচনায় দলকে চাঙ্গা রাখতে তার অবর্তমানে ছোট ভাই ক্লিন ইমেজের নেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে পার্টি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন। জি এম কাদের পার্টির কো-চেয়ারম্যান। এরশাদের অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়। এই চিঠির মাধ্যমে এরশাদ নেতা-কর্মীদের একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন, আগামী দিনে জি এম কাদেরের নেতৃত্বেই চলবে দল। তবে জি এম কাদেরকে এই চিঠি দেওয়ার পরপরই পার্টির একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। দলকে সহযোগিতা না করে নানাভাবে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন তারা। এটাও এইচ এম এরশাদের অজানা নয়। কিছু নেতার অসহযোগিতা ভালো চোখে দেখছেন না মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও।

মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, এরশাদের ব্যক্তি ইমেজের ওপর ভিত্তি করেই দলটি দাঁড়িয়ে আছে। এরশাদের নির্দেশ মানেই জাতীয় পার্টির নির্দেশ। এটা মানতে সবাই বাধ্য। যারা মানবে না, তারা দলের শুধুই সুবিধাভোগী। তারা দল ছাড়লেও কোনো ক্ষতি হবে না, বরং পার্টির জন্য ভালোই হবে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকার সময় দলের চেয়ারম্যানের সুস্থতা কামনা করে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সারা দেশে দোয়া করেছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে দোয়া মাহফিলে অংশ নেননি দলটির সিনিয়র নেতাদের বড় একটি অংশ। তারা অবশ্য বঙ্গভবন ও গণভবনে চায়ের আমন্ত্রণে ঠিকই সময়মতো হাজির হন। স্যুট-টাই পরে বসেন প্রথম সারিতে। নেতাদের এসব কর্মকা ও তৃণমূল নেতৃত্ব ভালোভাবে দেখছেন না। তারা এরশাদের নেতৃত্ব বা তার বার্তাকেই গ্রহণ করছেন।  এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, ‘এটা ঠিক যারা সুযোগ-সুবিধার জন্য রাজনীতি করেন বিশেষ করে যারা এমপি-মন্ত্রী হন তারা চলে যেতে পারেন। আর এমন নেতাদের সরকারি দলে চলে যাওয়াই ভালো, এতে দল নিজস্ব চরিত্রে দাঁড়াতে পারবে। তবে এইচ এম এরশাদ না থাকলে জাতীয় পার্টি বিলীন হয়ে যাবে এটা ঠিক নয়।’ বিএনপির উদাহরণ টেনে বলেন, ‘জিয়াউর রহমান চলে যাওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছেন। বাংলাদেশে দুটি ধারার রাজনীতি বিদ্যমান। প্রথমত, আওয়ামী লীগ মধ্যপন্থাধারার রাজনীতি করে। আর দ্বিতীয়ত, জাতীয় পার্টি জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতি করে। বিএনপিও জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতি করে। বর্তমানে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে। বিএনপি যত দুর্বল হবে জাতীয় পার্টি তত শক্তিশালী হবে। এক্ষেত্রে জাপার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে যদি আমরা তেমনভাবে সংগঠনকে গোছাতে পারি।’  এদিকে জাতীয় পার্টির কয়েকজন এমপি ঘোষণা দিয়ে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তাদের সংসদে এনেছেন। প্রধানমন্ত্রীও নির্বাচনের সময় মহাজোটের সমাবেশে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নৌকায় তুলে নেবেন বলে জানিয়েছেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির কী হবে? দলটির দায়িত্বশীল ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদের এমপি এবং সাবেক এমপি-মন্ত্রী অনেকে, যারা এরশাদকে নয়, ক্ষমতাকে ভালোবাসেন তারা আওয়ামী লীগে যোগ দেবেন। আর যারা এরশাদ ও দলকে ভালোবেসেছিলেন, তারা ঠিকই জাতীয় পার্টিকে সামনে রেখে পথ চলবেন। এইচ এম এরশাদের দেখানো পথেই চলবেন।  এ প্রশ্নে প্রেসিডিয়াম সদস্য পার্টির সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘রাজনীতি নদীর ঢেউয়ের মতো। কখনো থেমে থাকে না। উত্থান-পতন রাজনীতির চরিত্র। মনে রাখতে হবে, আমরা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নৌকা দিয়েই পারাপার হই। লাঙ্গল দিয়ে চাষ করি। এখন মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছি। চূড়ান্ত পর্যায়ে কী হয় বিষয়টি পরিষ্কার হতে আরও কিছু সময় লাগবে।’ জানা যায়, এ পর্যন্ত পাঁচবার ভাঙনের কবলে পড়ে জাতীয় পার্টি। তার অবর্তমানে দলটির কী হাল হবে তা নিয়ে শংকিত এরশাদপ্রেমী নেতা-কর্মীরা। এইচ এম এরশাদের অসুস্থতা এবং তার অবর্তমানে জি এম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ঘোষণার পর থেকেই পার্টির অধিকাংশ সিনিয়র নেতাকে দলীয় কর্মকাে  নিষ্ক্রিয় দেখা যায়। এমনকি পার্টির বনানী ও কাকরাইল কার্যালয়েও সিনিয়র নেতাদের দেখা মিলছে না। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দলটি মহাজোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় পার্টির বেশিরভাগ নেতা এমপি-মন্ত্রী হওয়ার আকাক্সক্ষায় নিজ দলের চেয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন জাপার এমপিরা। পার্টির তৃণমূল নেতাদের মতে, এরশাদ জীবিত থাকাবস্থায়ই যেখানে জাপার দলীয় সংসদ সদস্য সেখানেও কর্মীরা অবহেলিত। সেসব এলাকায়ও আমাদের এমপিরা সব সুযোগ-সুবিধা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া পার্টিতে জি এম কাদের সক্রিয় হওয়ায় আগে যারা এইচ এম এরশাদকে ঘিরে রাখতেন তারা ভিড়তে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মহাজোট থেকে মাত্র ২২টি আসন ছাড় পায়। আমরা যারা মহাজোটের প্রার্থী হতে পারলাম না তাদের ঢাকায় ডেকে একটা সান্ত্বনাও দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না দল। নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ বড় বড় সমাবেশ করল আমরা কিছু করতে পারলাম না। পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ সুস্থ থাকলে আমাদের খোঁজ নিতেন, সান্ত্বনা দিতেন। এইচ এম এরশাদ না থাকলে হয় সরাসরি আওয়ামী লীগে চলে যাব, না হয় দলই আর করব না। নেতা-কর্মীরা বলছেন, এইচ এম এরশাদ জীবিত অবস্থায় তার উত্তসূরির নাম ঘোষণা করলেও পার্টির সিনিয়র নেতাদের সক্রিয় করতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য গড়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পার্টির চেয়ারম্যানের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি হয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বরের ভোটেও আওয়ামী লীগ তাদের সংসদে এনেছে বলে জাহির করে। এ অবস্থায় এইচ এম এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির কী হবে- এ প্রশ্ন সবার। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ব্যক্তি ইমেজের ওপর ভিত্তি করে দলটি দাঁড়িয়েছে। আমরা এখন তার দিকেই তাকিয়ে আছি। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। দলের ভবিষৎ নিয়ে চিন্তা করছি না। আমরা চাই এইচ এম এরশাদ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার লাঙ্গলের হাল ধরবেন।’ জানতে চাইলে পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, জাতীয় পার্টি অনেক চড়াই-উত্তরাই পেরিয়ে আজ এই পর্যায়ে এসেছে। আমি বিশ্বাস করি দলটি যে কোনো পরিস্থিতিতে স্বকীয়তা নিয়ে অবশ্যই টিকে থাকবে। দলের প্রাণ কর্মী-সমর্থকরাই পার্টিকে বাঁচিয়ে রাখবেন।


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর