Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:০৩

ঝুঁকিপূর্ণ ছিল অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা আতঙ্ক কাটেনি রোগীদের

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে আগুন

সাখাওয়াত কাওসার

ঝুঁকিপূর্ণ ছিল অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা আতঙ্ক কাটেনি রোগীদের
অগ্নিকাণ্ডের পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি বিধ্বস্ত বারান্দা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

ঝুঁকিপূর্ণ ছিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা। ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর ও ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে দুই দফা সতর্ক করার পরও টনক নড়েনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও বিভিন্ন ওয়ার্ডে কেবল ফায়ার এক্সটিনগুইসার প্রদর্শন করেই দায়সারা দায়িত্ব পালন করেছিল হাসপাতাল        কর্তৃপক্ষ। ফায়ার অ্যালার্ম না থাকায় আগুন লাগার পরও অনেকটা সময় ধরে টের পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে অবহিত হয়ে ৫ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার আগেই আগুন তিন তলা পর্যন্ত স্পর্শ করেছিল বলে নিশ্চিত করেছেন সূত্র। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভয়াবহ অগ্নিকাে র পর গতকাল আংশিকভাবে চালু হয়েছে হাসপাতালটি। তবে আতঙ্ক কাটেনি রোগী ও তাদের স্বজনদের।

এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল বারিধারায় তার বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুনের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। দেশের সব মেডিকেল হাসপাতাল পুরনো হয়ে গেছে। হাসপাতালগুলোর ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আধুনিক করা প্রয়োজন। ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। নিয়মিতভাবে অগ্নিনির্বাপক মহড়ার ব্যবস্থা করা হবে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুনের ঘটনাটি শুধুই শটসার্কিট থেকে না অন্য কোনো কারণে হয়েছে তা আমরা খতিয়ে দেখব। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আলাদা একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যাপারে অনুরোধ করা হয়েছে। তিনিও কমিটি করে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।’ গতকাল দুপুরে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আংশিক চালু হয়েছে। আগুন লাগার কারণে সরিয়ে নেওয়া রোগীর অনেকেই আবার হাসপাতালে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে রোগী ও তাদের স্বজনদের চোখে-মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু আগুনে শিশু ওয়ার্ড মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আপাতত এ হাসপাতালে শিশু রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে না।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা গেল কেউ অ্যাম্বুলেন্সে করে, কেউ সিএনজি বা রিকশায় করে রোগীদের নিয়ে হাসপাতালে ফিরে আসছেন। হাসপাতালের আইসিইউ, এনআইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ ও বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড পুরোদমে চালু হয়েছে। তবে তৃতীয় তলার শিশু ও মহিলা ওয়ার্ড রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক গঠিত পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। অগ্নিকাে  ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালের বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখছেন তারা। বক্তব্য নিচ্ছেন হাসপাতালে কর্মরত স্টাফ ও চিকিৎসকদের।

কথা হয় হাসপাতালের ৪ নম্বর মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সালমা বেগমের ছেলে আবুল মিয়ার সঙ্গে। তার মা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ডান পাশ প্যারালাইজড হয়ে আছেন। সাত দিন ধরে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আগুন লাগার সময়ের দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে নিজেকে সামলিয়ে বলেন, ‘ভাই, অনেক ভয় পাইছিলাম। ভাবছিলাম প্যারালাইজড মা এই বুঝি ভয় পাইয়া আবার শেষ হইয়া গেল! রাতে অ্যাম্বুলেন্সে কইরা পাশের হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম। বিকাল ৪টার দিকে এহানে আবার আইছি।’

জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় যশোরের নায়েম আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, আগুন লাগার পর তিনি ও অন্য স্বজনরা মিলে তার বাবাকে পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সকালে বাবাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। নায়েম জানান, সোহরাওয়ার্দী থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে গেছেন এমন সাত-আট জন রোগীকে তিনি সকালেই ফিরে আসতে দেখেছেন।

অনেকটা একই অবস্থা ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কলি বেগমের (২৫)। তিনিও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন। আগুন লাগার খবর পেয়ে তার ভাই মো. হৃদয় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়েই হাসপাতাল ছেড়ে ওঠেন এক আত্মীয়ের বাসায়। আইসিইউ ও ডায়ালাইসিস বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অগ্নিকাে র পর গতকাল পর্যন্ত এ দুটি ইউনিট চালু হয়নি। আগুন লাগার সময় আইসিইউ ইউনিটে ১০ ও ডায়ালাইসিস ইউনিটে ছয়জন রোগীর ডায়ালাইসিস চলছিল। এদিকে, আগুন লাগার বিষয়টি নিয়ে অনেকে ভিন্ন মন্তব্য করছেন। স্টোর রুমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী থাকার পরও সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। বেশির ভাগেরই মন্তব্য ছিল অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিয়ে। স্টোর রুম থেকেই আগুন তিন তলা পর্যন্ত ছড়ায়। পুরো সিঁড়ি রুম আগুনে পুড়ে গেছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের পলেস্তরা খসে পড়ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডের বেডগুলো পুড়ে গেছে।

হাসপাতালের পরিচালক উত্তম কুমার বড়ুয়া সাংবাদিকদের জানান, বিকাল পর্যন্ত প্রায় আট শর মতো রোগী হাসপাতালে ফিরে এসেছেন। পুরোদমে চালু করার কাজ চলছে। বেশির ভাগ অংশ চালু হয়েছে। হাসপাতালে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ রোগীকে তৎক্ষণাৎ বিভিন্ন হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ফায়ার সার্ভিসের সতর্ককরণ চিঠির বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০১৭ সালের ১২ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর ৪৩৩টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সার্ভে করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি ছাড়া বাকিগুলোর অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ঝুঁকিপূর্ণগুলোর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও আছে।

৯৯৯-এর মাধ্যমেই খবর পায় ফায়ার : জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমেই খবর পায় ফায়ার সার্ভিসের মোহাম্মদপুর স্টেশনের আসাদগেট ইউনিট। বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে ৯৯৯-এর ফোন রিসিভ করেন ইউনিটের ফায়ারম্যান সজীব। অবহিত হওয়ার ৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছান বলে জানিয়েছেন এই ইউনিটের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. সাব্বির আহমেদ।

মন্ত্রী আরও যা বললেন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আগুনের ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ৩৮৫ জন রোগীকে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজনকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। আশপাশের সব হাসপাতালে মোট ৪৯২ জন রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) যখন আগুন লাগে তখন হাসপাতালে ১২০০ রোগী ভর্তি ছিলেন। রাত ১০টার পরে হাসপাতালের ১৬টি ইউনিটের মধ্যে ১৪টি চালু করা হয়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হাসপাতালের ইলেকট্রিক তার ও লাইনগুলো ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হবে। ভিতরে যেখানে আগুন লেগেছে সেখানে কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ।

প্রসঙ্গত. বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় তিন ঘণ্টা পর আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর