Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:০৮

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ, কী হচ্ছে জামায়াতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ, কী হচ্ছে জামায়াতে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করলেন দলটির জয়েন্ট সেক্রেটারি-জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, গত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন ’৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তানকে সমর্থনের কারণ ব্যাখ্যা করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এনিয়ে জামায়াতে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

এদিকে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামীকে নতুন অবয়বে আনার প্রস্তাব করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্যরা। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করে বিতর্কে থাকা জামায়াত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও গত ১০ বছরের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শূরা সদস্যরা এ প্রস্তাব করেন। দলের বর্তমান সংগঠন ও কাঠামো ঠিক রেখে নতুন নামে নতুন সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের  কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদকে। এই সংগঠনের নাম, কাঠামো, ধরন নিয়ে এ কমিটি কাজ শুরু করেছে। ছড়িয়ে থাকা জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের নতুন সংগঠনে যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য দল থেকে আগ্রহী হলে তাদেরও যুক্ত করা হবে। সংগঠনের মূল পরিচয় হবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক। নতুন এই সংগঠনে বর্তমান জামায়াতের পরিচিত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সব দলেই সব সময় চিন্তা-ভাবনা থাকে। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি। তবে এখনো  মৌলিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জানা যায়, একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা এবং দলের নেতাদের যুদ্ধাপরাধের কারণে জামায়াত রাজনীতিতে সবসময় বিতর্কিত। ২০১০ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর থেকেই জামায়াত চাপে রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতার মৃত্যুদ  কার্যকর হয়েছে। আরও দুই নেতার ফাঁসির রায় হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। একজন ভোগ করছেন আমৃত্যু কারাদ । যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে ২০১০ সালে আন্দোলনে নেমেও সফল হতে পারেনি জামায়াত। ২০০৯ সালেও একই প্রস্তাব করা হলেও তা দলীয় ফোরামে অনুমোদন পায়নি। আর এবার নতুন নামে দল গঠনের প্রস্তাব এসেছে জামায়াতের মজলিসে শূরা থেকেই। চলতি বছরেই নতুন দল গঠিত হতে পারে। জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জামায়াতের মজলিসে শূরার সভায় এ প্রস্তাব এলেও দলের নাম চূড়ান্ত হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, নতুন দল ধর্মভিত্তিক হবে না। নতুন দল গঠিত হলেও বিলুপ্ত হবে না নিবন্ধন হারানো জামায়াত। দলটি আদর্শিক সংগঠন হিসেবে ভোটে থাকবে না। ভোটের রাজনীতিতে থাকবে নতুন দল। তবে একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরিকল্পনা নেই জামায়াতের। গত ৯ বছর জামায়াতের ওপর চলা দমনপীড়ন থেকে বাঁচতে এ ছাড়া আর পথ নেই বলেও মনে করেন তারা। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার কয়েকজন সদস্য জানান, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান, উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর আচরণ এবং ১০-১২ বছর ধরে রাজনৈতিক যে বাস্তবতার মধ্য দিয়ে জামায়াতকে যেতে হয়েছে, সেসব দিক বিবেচনা করে ‘জামায়াত’ হিসেবে রাজনৈতিক সাফল্য অনেকটাই সুদূরপরাহত। নতুন সংগঠন করতে মজলিসে শূরার সদস্যরা সময়সীমা বেঁধে দেননি। তারা প্রস্তাব করেছেন দ্রুততার সঙ্গে করতে। নতুন দলের রূপরেখা সম্পর্কে সূত্র জানিয়েছে, নতুন নামে দল গঠিত হলে তা হবে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্লোগান নিয়েই। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কেও নতুন দলের অবস্থান হবে পরিষ্কার। নতুন দল জামায়াতের একাত্তরে স্বাধীনতার ভূমিকাকে সমর্থন করবে না। ভারত, তুরস্ক, মিসর, তিউনিশিয়া, সুদানসহ আরও কয়েকটি দেশের উদাহরণ টেনে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।

রাজ্জাকের পদত্যাগ : ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দল  থেকে পদত্যাগ করেছেন। গতকাল দলের আমির মকবুল আহমদকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে মূলত তুলে ধরেছেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকাকেই। তিনি বলেছেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে দলটি যাতে ক্ষমা চায়Ñ দীর্ঘদিন তিনি সে চেষ্টাই করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, কিন্তু সে দাবি অনুযায়ী জামায়াত নিজেকে এখন পর্যন্ত সংস্কার করতে পারেনি। চিঠিতে বলা হয়, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আজও দলের  নেতৃবৃন্দ ’৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেনি। এমনকি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেনি। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার করে জাতির সঙ্গে সে সময়ের নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তার মতে, জামায়াত ’৬০-এর দশকে সব সংগ্রামে অংশ নিয়েছে, ’৮০-র দশকে আট দল, সাত দল ও পাঁচ দলের সঙ্গে যুগপৎভাবে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। কিন্তু দলটির এসব অসামান্য অবদান ’৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে স্বীকৃতি পায়নি। ব্যারিস্টার রাজ্জাক জানান, ২০০১ সালে জামায়াতের সে সময়ের আমির এবং সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রী হওয়ার পর বিজয় দিবসের আগেই ১৯৭১ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন একটি কমিটি এবং বক্তব্যের খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। রাজ্জাকের সঙ্গে মহব্বতের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে : এদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান গতকাল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা আশা করি তার সঙ্গে আমাদের মহব্বতের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। তার অতীতের সব অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তার পদত্যাগে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত।


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর