Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ মার্চ, ২০১৯ ২৩:৩০

স্বাভাবিক জনজীবনেও কাটেনি সেই শোক

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বাভাবিক জনজীবনেও কাটেনি সেই শোক
গতকাল পুরান ঢাকায় আগুনে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মানববন্ধন -বাংলাদেশ প্রতিদিন

এখনো চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কাটেনি প্রিয়জন কিংবা প্রতিবেশী হারানোর শোক। সেই ভয়াবহ ঘটনার দশম দিন ছিল গতকাল। এদিনও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও পোড়া স্থান ঘুরে ঘুরে দেখেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার মাঝেও নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। এ ছাড়া বিভিন্ন সংগঠন নিমতলী থেকে চকবাজার পদযাত্রা ও মানববন্ধনও করে।

চিরচেনা পুরনো রূপ ফিরতে শুরু করেছে, খুলেছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দেখা মিলেছে স্বাভাবিক জনজীবনের। তবুও ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৭০ জন মানুষের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে চকবাজারের চুড়িহাট্টাসহ পুরান ঢাকার অন্যান্য এলাকা। আগুনের সেই বিভীষিকাময় ঘটনা যেন পিছু ছাড়ছে না স্থানীয়দের।

সরেজমিন দেখা গেছে, বেলা পৌনে ১টার দিকে চুড়িহাট্টা মোড়ের পাশে মসজিদে চলছিল জুমার বয়ান। একে একে আসতে থাকেন মসজিদের মুসল্লিসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ। নামাজের আগ মুহূর্তে তারা ঘুরে ঘুরে দেখেন ধ্বংস প। এমন মানুষের সংখ্যা শতাধিক। কৌতূহলী অনেকেই মোবাইলে  তুলেছেন ছবি। দেখেছেন দূর থেকে ভবনের ভিতরের চিত্র। একে অন্যের সঙ্গে সেদিনের স্মৃতিচারণ করেন। কেউ বলেন, আগুনের এক ঘণ্টা আগে এই সড়ক দিয়ে গেছেন। কেউ আবার পাশের হোটেলের খাবারের কথাও বলছিলেন। আগুন লাগা আর ছড়িয়ে পড়াসহ নানা বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ ছিল নিজেদের মধ্যেই। অনেককেই আগুনের সূত্রপাত নিয়ে তর্ক করতে দেখা যায়।

এরই মধ্যে চুড়িহাট্টা মোড়ে আগুনে পোড়া যানবাহনের অংশ, পারফিউম, প্রসাধনী ও অন্যান্য ছাইয়ের অংশ পরিষ্কার করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ভবনসহ আশপাশের অন্তত ১০টি বাদে অন্যান্য ভবনে গতকাল দুপুরে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এখনো সেখানে অবস্থান করছে। রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। এদিকে ওয়াহিদ ম্যানসনের বেজমেন্টে মজুদ করা রাসায়নিক সরানোর বিষয়ে আজ দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়াও সকাল ১০টার দিকে নগর ভবন থেকে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল অপসারণে ডিএসসিসির নেতৃত্বে সরকারি গঠিত টাস্কফোর্সের অভিযান বের হবে বলে জানানো রয়েছে।  এদিকে জুমার নামাজ শেষে পুরান ঢাকার বাবুবাজার ও নিমতলীতে মানববন্ধন করে বিভিন্ন সংগঠন। এ সময় পুরান ঢাকায় ক্ষতিকর সব দাহ্য পদার্থ বন্ধের দাবি করা হয়। পরে অগ্নিকান্ডের শোক ও প্রতিবাদ জানিয়ে নিমতলী থেকে চকবাজার পর্যন্ত একটি প্রতিবাদ পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এই পদযাত্রায় নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনার কৈফয়ৎ দাবি করা হয়। এর আগে ‘ট্যাক্স দেই, পুড়ে মরবো কেন?’ শিরোনামে ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে আয়োজন করা হয় প্রতিবাদী এই পদযাত্রার। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে নিমতলীতে ২০১০ সালের অগ্নিকান্ডে নিহতদের স্মৃতিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধের পাদদেশ থেকে শুরু হয় পদযাত্রাটি। এ সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্তসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বক্তব্য দেন। পরিবেশন করা হয় প্রতিবাদী স্বরচিত গান। বক্তারা প্রশ্ন রাখেন, আমরা বছর বছর ট্যাক্স দেই। প্রতিবছর ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেট হয়। এত টাকা যায় কোথায়? তবুও কেন আমাদের পুড়ে মরতে হয়? এরপর ‘কৈফিয়ৎ চাওয়া জনগণ’ ব্যানারে চানখাঁরপুল, জেলখানার মোড় হয়ে চকবাজার মোড়ে গিয়ে শেষ হয় পদযাত্রাটি। এ সময় পুরান ঢাকার মৃত্যুর মিছিল থামাতে ৫ দফা দাবি করা হয়। দাবিগুলো হলো- বাসাবাড়ি থেকে অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম অপসারণ, রাসায়নিকের ব্যবসার ক্ষেত্রে বীমার ব্যবস্থা করা, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার গ্যাস অপসারণ, ফিটনেসবিহীন মোটরযানের চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করা, গলিতে গলিতে যথেষ্ট পরিমাণে অটোমেটিক অগ্নিনির্বাপণ সিলিন্ডার এবং ফায়ার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা তৈরি করা, যানজট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ভিআইপি চলাচলের নামে রাস্তা আটকে দেওয়া আইন করে নিষিদ্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ ট্রান্সমিটার ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার অপসারণ করা। গতকাল ভোরে চুরিহাট্টার অগ্নিকান্ডে দগ্ধ মেহেদী হাসান রেজাউল (২২) নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শংকর পাল জানান, আগুনে রেজাউলের শরীরের ৫১ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। জানা যায়, কেরানীগঞ্জ আটিবাজার এলাকায় থাকতেন রেজাউল। তিনি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বিল্লাল ব্যাপারীর ছেলে। আর ওয়াহিদ ম্যানসনের দ্বিতীয়তলায় ‘অল ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি পারফিউম গোডাউনে চাকরি করতেন। অগ্নিকাে র রাতে দগ্ধ অবস্থায় ওই ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি।


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর