Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ মার্চ, ২০১৯ ২৩:৩৪

ফিটনেসবিহীন গাড়ির ভাগাড়

সব বাসই লক্কড়-ঝক্কড়, সামনে পেছনে ভাঙা, রংচটা, জোড়াতালির সিটকভার, ট্রাক সিএনজি টেম্পো মাইক্রোর একই দশা

সাঈদুর রহমান রিমন

ফিটনেসবিহীন গাড়ির ভাগাড়

ফিটনেসবিহীন হাজার হাজার গাড়ির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রাজধানী। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে লক্কড়-ঝক্কড় মার্কার যানবাহন। বাস-মিনিবাসের বাম্পারসহ নানা অংশ খুলে ঝুলতে থাকে বিপজ্জনকভাবে। কোনোটার সামনের অংশ ভাঙা, স্থানে স্থানে ছোট-বড় ফোকলা, দরজা-জানালার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। কোনোটির রং চটা, কোনোটির ছাল ওঠা। জোড়াতালি দিতে দিতে সিট-কভারের ওপর পড়ে গেছে দুর্ভিক্ষের ছাপ। এসব গণপরিবহনের সঙ্গে যোগ হয়েছে ফিটনেসবিহীন ট্রাক, লরি, সিএনজি, টেম্পো, মাইক্রো ও প্রাইভেটকার। সেসব গাড়ি ইঞ্জিনে ভয়ানক শব্দ তুলে, নিকষ কালো ধোঁয়া উড়িয়ে দাপিয়ে বেড়ায় রাজপথ-জনপথ। সড়ক ও পরিবহন খাতের নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করেছে। দিন দিনই তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। সূত্রপাত ঘটছে নানা বিশৃঙ্খলার। রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন। কিন্তু গাড়ির মালিক, রুট কমিটি, ট্রাফিক বিভাগ-কারও যেন সেদিকে দেখারও ফুরসত নেই। সবাই ছুটছেন টাকার ধান্দায়। ঢাকায় আট সহস্রাধিক বাস-মিনিবাসের ফিটনেসের মেয়াদ পাঁচ-সাত বছর অতিক্রান্ত হলেও ফিটনেস সার্টিফিকেট মিলছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিআরটিএতে ‘কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনা’ চালুর পর থেকে চোরাগোপ্তা পথে ফিটনেস সার্টিফিকেট ম্যানেজের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সে হিসেবে কমবেশি ৮-১০ বছর ধরেই ফিটনেসবিহীন কয়েক হাজার বাস-মিনিবাস দিব্যি যাত্রী বোঝাই করে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। সেসব গাড়ির বেশির ভাগ চালকেরও কোনো লাইসেন্স নেই। এ ক্ষেত্রে গাড়ির মালিকের রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোই অবৈধ গাড়ির রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী চারটি পরিবহন কোম্পানির অন্তত দেড় হাজার গাড়ি বছরের পর বছর ধরে ফিটনেস ও রুট পারমিটবিহীন কাগজপত্র ছাড়াই দিব্যি চলাচল করছে। প্রতি মাসে তারা ট্রাফিক বিভাগকে কোটি টাকা মাসোয়ারা দেওয়ার বিনিময়ে অবাধে চলাচল করছে এবং যাত্রী বহনের সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে গাজীপুরে ‘অনাবিল’ ও ‘অনাবিল সুপার’ পরিবহন নামে দুটি কোম্পানির আড়াই শতাধিক বাস-মিনিবাস চলাচল করে। এর মধ্যে মাত্র ১২টি গাড়ির ফিটনেস আছে। তবে এই ১২টি গাড়ির কোনো চালকের লাইসেন্স নেই। বাকি গাড়িগুলোর চালকদের কথা তো বলাই বাহুল্য। একইভাবে দুটি পৃথক রুটে ঢাকা থেকে গাজীপুরে ‘বলাকা’ পরিবহনের ১২০০ গাড়ি চলাচল করে থাকে। এর মধ্যে মাত্র ৭২টি গাড়ির ফিটনেস থাকলেও বাকি গাড়িগুলো ফিটনেসবিহীন চলাচল করছে। অতিসম্প্রতি গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যা করে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস। এই সুপ্রভাত কোম্পানির গাড়ির সংখ্যা সাড়ে তিন শতাধিক। এর মধ্যে মাত্র ২০টি গাড়ির ফিটনেসসহ কাগজপত্র ঠিক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন, চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী, রুট পারমিট ছাড়া গাড়িগুলো রাজপথ দাপিয়ে বেড়ালেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উপায় নেই। অবৈধ গাড়ির বেআইনি চলাচলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে গেলে পরিবহনের মালিক সমিতি, চালক ইউনিয়ন, শ্রমিক ফেডারেশনসহ নানা সংগঠনের ব্যানারে মুহূর্তেই হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘটের সীমাহীন নৈরাজ্যের সৃষ্টি করা হয়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের পরিবর্তে মাসোয়ারার বিনিময়ে গাড়িগুলোর চলাচল নির্বিঘœ রাখাকেই ঝুঁকিমুক্ত কৌশল বলে মনে করেন। পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা ও গাড়ির মালিকদের দাপটে চালক-হেলপাররা আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছেন না, লেন মানছেন না কেউ। যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস নিয়ে বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ের মাধ্যমে তারা মরণঝুঁকির পাল্লাপাল্লিতে লিপ্ত হচ্ছেন প্রায়ই। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যাত্রীরা হাত-পা খোয়াচ্ছেন, পথচারীরাও প্রাণ হারাচ্ছেন গাড়ির চাপায়। চলতে চলতে মাঝপথে আড়াআড়িভাবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আটকে রাখা হয় পেছনের অসংখ্য যানবাহন। চালকের সহযোগী কন্ডাক্টর-হেলপাররা যাত্রীদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। যাত্রীদের সঙ্গে বাদানুবাদ, হাতাহাতিতেও তারা জড়িয়ে পড়েন। এ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, খেয়ালখুশিমতো ভাড়া আদায়, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোসহ নানা কারণে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দায়িত্বশীলরা পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে চাঁদাবাজি, টোকেন-বাণিজ্য আর বখড়াবাজির মচ্ছবে মেতে উঠেছেন। একশ্রেণির টিআই, পিআই, সার্জেন্টসহ ট্রাফিক সদস্যরা মাসোয়ারা আদায়ের বিপরীতে চালকদের যথেচ্ছা গাড়ি চালানো, ব্যস্ত মোড়, এমনকি ফ্লাইওভারের ওপর গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, যানজট সৃষ্টিসহ যাত্রী হয়রানির সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের চোখের সামনেই কাগজপত্রবিহীন চলাচলের অনুপযোগী গাড়ির জট বাঁধছে, লাইসেন্সবিহীন চালকেরা নানা অপকর্ম করছেন। কিন্তু এই দায়িত্বশীলরা, যাদের দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, তারা এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন। অন্যদিকে রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ট্রাফিক সদস্যরা ভুক্তভোগী যাত্রী ও পথচারীদের কোনো অভিযোগ আমলে নেন না, পাত্তাও দেন না। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, এমনকি সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনায়ও পরিবহন চালকদের পক্ষে দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

রং বদলের পর এবার নামছাড়া সেই সুপ্রভাত : রং বদলের পর এবার নাম ছাড়াই রাজধানীতে চলেছে সুপ্রভাত পরিবহনের কয়েকটি বাস। এর আগে নাম বদলে সুপ্রভাত পরিবহনের নাম রাখা হয় ‘সম্রাট’। জানা যায়, উত্তরা থেকে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত নামছাড়া রং বদলানো সুপ্রভাতের কয়েকটি বাস চলাচল করে। তবে এ বাসগুলো নির্দিষ্ট স্টপেজের আগে-পরে দরজা বন্ধ রেখে চলাচল করেছে। যাত্রী ওঠানামার সময় নির্দিষ্ট স্টপেজের ফুটপাথের কাছাকাছি থামানো হয়।


আপনার মন্তব্য