শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:২১

অবশেষে যুবলীগের সম্রাট গ্রেফতার

ছয় মাসের জেল দিয়ে দুই জনকেই পাঠানো হয়েছে কারাগারে, টর্চার মেশিন অস্ত্র ইয়াবা উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক

অবশেষে যুবলীগের সম্রাট গ্রেফতার
গ্রেফতারের পর সম্রাটকে নিয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। উদ্ধার করা টর্চার মেশিন মদ ইয়াবা -রোহেত রাজীব

ঢাকা মহানগর আওয়ামী যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাব।

গতকাল ভোররাত সাড়ে ৫টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সীমান্তবর্তী পুঞ্জশ্রীপুর গ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়। এরপর সম্রাটকে নিয়েই তার কাকরাইলের কার্যালয়ে অভিযান চালায়। প্রায় ৫ ঘণ্টার অভিযানে র‌্যাব ওই কার্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ক্যাঙ্গারু ও হরিণের চামড়া, ইয়াবা এবং একটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে। বন্যপ্রাণীর চামড়া রাখার অপরাধে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের ভ্রাম্যমাণ আদালত সম্রাটকে ছয় মাসের কারাদ  দেন। পরে রাত ৭টা ৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে সম্রাটকে নিয়ে যায় র‌্যাব।

জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে পুঞ্জশ্রীপুর গ্রামে র‌্যাবের ১২ থেকে ১৪টি গাড়ি আশপাশে অবস্থান নেয়। এ সময় সেখানে আশপাশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। মধ্যরাতে মুনির চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির দোতলা বাড়ি ঘেরাও করে রাখে র‌্যাব-১। তখন ওই বাড়িতেই সম্রাট এবং যুবলীগ নেতা আরমান অবস্থান করছিলেন।

সম্রাট ও আরমানকে আটকের পর আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক হেলাল বলেন, মুনির চৌধুরী স্থানীয় জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি ফেনীর মেয়র আলাউদ্দিনের ভগ্নিপতি। আলাউদ্দিন জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তবে এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন বাচ্চু যুবলীগ নেতা সম্রাটের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার মাধ্যমেই সম্রাট মুনির চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান নেন। সেখান থেকে সীমান্ত পার হয়ে তার ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। সম্রাটের বাড়ি ফেনী বলেও জানান তারা।

চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগের কারণে যুবলীগ নেতা সম্রাটের নাম আলোচনায় আসে। অভিযানে যুবলীগ, কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা র‌্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। কিন্তু সম্রাট ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভোরে গ্রেফতারের পর কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এনে দুপুর ১২টার দিকে তাকে উত্তরায় র‌্যাব সদর দফতরে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের নিয়ে অভিযানে বের হয় র‌্যাব। বেলা সোয়া ১টার দিকে সম্রাটকে নিয়ে তার কাকরাইলের কার্যালয়ে যাওয়া হয়। প্রায় একই সময়ে শান্তিনগরের সম্রাটের ভাই বাদলের বাসায় ও মহাখালী ডিওএইচএসে সম্রাটের বাসায়ও অভিযান চালায় র‌্যাব।

বেলা পৌনে ২টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের উপস্থিতিতে কালো গ্লাসের সাদা একটি মাইক্রোবাসে করে সম্রাটকে তার কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ র‌্যাব সদস্যরা তাকে কার্যালয়ের ভিতরে নিয়ে যান। একপর্যায়ে ভবনের প্রধান কলাপসিবল গেট আটকে দেওয়া হয়। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর নয়তলা বিশিষ্ট এই ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে ছয় দিন অবস্থান করেছিলেন সম্রাট। পরে তিনি অন্য জায়গায় চলে যান। সন্ধ্যা ৬টার দিকে অভিযান শেষ করে ভবনের নিচে এসে সাংবাদিকদের ভিতরে নিয়ে যান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। ভবনে পাওয়া বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ইয়াবা, ইলেকট্রিক শকের মেশিন, ক্যাঙ্গারু ও হরিণের চামড়া, ডলার ও ভারতীয় রুপি জব্দ করে তৃতীয় তলায় প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। এরপর বিভিন্ন তলায় ঘুরে কয়েকটি আলিশান বেড রুম, ফ্রিজ, রাজকীয় চেয়ার দেখতে পাওয়া যায়। বেড রুমের পাশে ফ্রিজও রাখা ছিল। যেখানে কাটা ইলিশ মাছ ও মদের বোতল সাজিয়ে রাখা। এরপর ভবনের ছাদে গিয়ে বড় বড় গাছের একটি বাগান দেখা যায়। কার্যালয়ের ছাদের এই বাগানটিতে যাওয়া সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল বলে জানান র‌্যাব কর্মকর্তারা।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের জানান, অভিযানে এই কার্যালয় থেকে একটি ৭.৬৫ বিদেশি অস্ত্র, ৫ রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন, ১১৬০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৯ বোতল মদ, দুটি বন্যপ্রাণীর চামড়া ও দুটি ইলেকট্রিক শক মেশিন জব্দ করা হয়। আর আরমানকে মদ্যপ অবস্থায় থাকার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাকে ছয় মাসের কারাদ  দিয়ে কুমিল্লা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা হবে বলে জানান তিনি। এদিকে মহাখালী ডিওএইচএসের ২৯ নম্বর রোডে ৩৯২ নম্বর বাসায় র‌্যাব-২ এর একটি দল অভিযান চালায়। টানা প্রায় দুই ঘণ্টা অভিযান শেষে র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ডিওএইচএসের বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। তবে সেখানে অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী দাবি করেছেন, দুই বছর ধরে সম্রাট সেখানে যেতেন না। তিনি কাকরাইলে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে নিজ কার্যালয়েই থাকতেন। মিরপুর সেকশন-২, ব্লক-ই এর ৩/৬ নম্বর বাসায় দ্বিতীয় তলায় আরমানের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। বেলা ১টার দিকে ওই বাসাটি র‌্যাব সদস্যরা ঘিরে ফেলে। ৩টার দিকে নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট আনিসুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকে র‌্যাব সদস্যরা। প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযান শেষে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, র‌্যাবের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট আনিসুর রহমানকে নিয়ে আরমানের মিরপুরের ফ্ল্যাটে আমরা অভিযান চালাই। তবে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কারাদ  দেওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই ফ্ল্যাট ছেড়ে পালিয়ে যান তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাহানাজ আক্তার বিথী। ওই ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ব্যাংকের ১২টি চেক বই, মনিপুরী পাড়ায় একটি ফ্ল্যাট কেনার কাগজপত্র পাওয়া গেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য নেওয়া হয়েছে। তবে ওই ভবনের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সদস্য এবং নিরাপত্তা প্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আরমান মাসে মাত্র ২/১ দিন ওই ফ্ল্যাটে যেতেন। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ভোরে খালি হাতে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছেন বীথি। প্রসঙ্গত, গতকাল ভোরের দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে’ সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। সেখান থেকে তাকে ঢাকায় নিয়ে এসে তার অফিস ও বাসায় অভিযান চালালেও ক্যাসিনোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি র‌্যাব। তবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সম্রাটসহ কয়েকজন যুবলীগ নেতার কর্মকা  নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর চার দিনের মাথায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। ওই অভিযানের সময় যুবলীগের কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হলে সম্রাটের বিরুদ্ধেও অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ ওঠে। ক্যাসিনোবিরোধী ওই অভিযানের প্রথম দিন থেকেই সম্রাট কয়েকশ নেতা-কর্মী নিয়ে কাকরাইলে তার নিজ কার্যালয়ে অবস্থান নেন। পরে তার অবস্থান ও আটক নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। এরই মধ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর তার ব্যাংক হিসাব স্থগিত ও তলব করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর তার বিদেশ গমনে জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা খুঁজতে থাকেন সম্রাটকে। অবশেষে গতকাল ভোরে গ্রেফতার হন সম্রাট। এর দুই ঘণ্টার মাথায় সম্রাট এবং আরমানকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।


আপনার মন্তব্য