Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৩৭

বঙ্গবন্ধুর স্নেহের তোফায়েলের আজ শুভ জন্মদিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বঙ্গবন্ধুর স্নেহের তোফায়েলের আজ শুভ জন্মদিন

মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গভীর স্নেহধন্য তোফায়েল আহমেদের আজ শুভ জন্মদিন। সাবেক ডাকসু ভিপি, প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান গণমানুষের নেতা তোফায়েল আহমেদের আজ ৭৭তম জন্মদিন।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেকবার কারা নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সয়েছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রশ্নে কখনো মাথা নত করেননি। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সাগরবিধৌত ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে ইতিহাসের নায়ক তোফায়েল আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আজহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম ছিলেন এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৪ সালে ভোলা শহরের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের আলহাজ মফিজুল হক তালুকদারের জ্যেষ্ঠ কন্যা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তারা এক কন্যাসন্তানের জনক-জননী। তাদের কন্যা তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী চিকিৎসক, জামাতা জনাব তৌহিদুজ্জামান তুহিন খ্যাতনামা কার্ডিওলজিস্ট, বর্তমানে স্কয়ার হাসপাতালে কর্মরত। তার বড় ভাই জনাব আলী আশরাফ ’৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। তার একটি ছেলে তার মৃত্যুর ছয় মাস পর ১ জানুয়ারি ’৭৬-এ জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পর থেকে তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী শিশুপুত্র মইনুল হোসেন বিপ্লবকে নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহে বড় করে তাদের সঙ্গে রাখেন। বিপ্লব বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগমও একজন গণমুখী চরিত্রের দানশীল বিদুষী মহিলা। তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ’৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি পাস করেন যথাক্রমে ’৬২ ও ’৬৪ সালে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি করেন। কলেজ জীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হন ’৬২ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ’৬৪ সালে ইকবাল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ’৬৫-তে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি ও ১৯৬৬-৬৭-তে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

’৬৭ থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ছয় দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। উল্লেখ্য, ’৬৬-এর ৮ মে থেকে ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৩৩ মাস কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র সব রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা বাংলায় তৃণমূল পর্যন্ত তুমুল গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দীকে মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে গণজোয়ারে জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আর ’৬৯-এর ২৫ মার্চের মধ্যে তথাকথিত প্রবল পরাক্রমশালী লৌহমানব স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করে গৌরবের যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল। ’৬৯-এ তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ’৭০-এর জুনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধপূর্ব ছাত্র ও গণআন্দোলনে সফল নেতৃত্ব প্রদান করায় তিনি দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেন। আবাসিক হল ও ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সাহচর্যে আসেন। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা অতুলনীয়। ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ ও ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম সংগঠক এবং ’৭২-এ বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও বলবৎকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া’য় তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়; ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন; দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১২ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন। ’৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ’৭৩-এ নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ’৭৫-এ দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। ’৭৫-এ দেশের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ গঠিত হয়। বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। উল্লেখ্য, সে সময় ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রলীগ’, শ্রমিক সংগঠন ‘জাতীয় শ্রমিক লীগ’, কৃষক সংগঠন ‘জাতীয় কৃষক লীগ’ নামকরণ করা হয়।

তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে সফরসঙ্গী হন। ’৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনের সফরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা এবং ১ মার্চ পাঁচ দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কো গমন করেন। ’৭৩-এর ২৬ জুলাই প্রেসিডেন্ট জোসেফ ব্রোজ টিটোর আমন্ত্রণে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড; যুগোসøাভিয়া থেকে ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়ায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান; ৬ সেপ্টেম্বর চতুর্থ জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স গমন; ১৭ অক্টোবর সাত দিনের সফরে জাপানের রাজধানী টোকিও সফর করেন। ’৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান; ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা ত্যাগ এবং ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন; ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে ইরাকের রাজধানী বাগদাদ পৌঁছান।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকান্ডে র পরপরই তাকে প্রথমে গৃহবন্দী ও পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে খুনিরা অবর্ণনীয় শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করে। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দী অবস্থায় তাকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। ’৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরিন থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি সফলভাবে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের (বর্তমানে দলে ছয়জন সাংগঠনিক সম্পাদক দায়িত্বরত আছেন) দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, এই কালপর্বে দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে এ পদ অলংকৃত করে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

’৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ’৭৩, ’৮৬, ’৯১, ’৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বমোট আটবার তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ’৯১ ও ’৯৬-এর নির্বাচনে ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে ’৯১-এর জাতীয় সংসদে ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ পুনঃপ্রবর্তনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ’৯২-এ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিম লীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পবিত্র সংবিধান থেকে কলঙ্কিত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ অপসারণ, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। ’৯৬-এ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গণরায়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর মহান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’-এ তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। অর্পিত দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করে দেশ-বিদেশে রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন। দুবার বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মিনিস্টারিয়েল কনফারেন্সে যথাক্রমে সিঙ্গাপুরে প্রথম, সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় দ্বিতীয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে তৃতীয়, কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে চতুর্থ ও আর্জোন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে পঞ্চমবারের মতো যোগদান করে স্বল্পোন্নত দেশের মুখপাত্র ও সমন্বয়কের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন এবং বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য উন্নত দেশগুলোয় শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের অঙ্গীকার আদায় করেন। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা এসক্যাপ ও ফাও-এর মিটিংয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এসব আন্তর্জাতিক ফোরামে তার জোরালো ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্বে স্বদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক স্বৈরশাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগঠিত করে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তোফায়েল আহমেদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়ার আমলে তোফায়েল আহমেদের আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট করা হয়; হাই কোর্ট তাকে জামিন প্রদান করলেও স্বৈরশাসক তাকে মুক্তি দেয়নি। তখন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে দীর্ঘ ৩৩ মাসের বন্দীদশা থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন মেয়াদে চারবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। ’৮২ সালের ২৪ জানুয়ারি সামরিক শাসন জারির পর ২৬ জানুয়ারি সাভারে গ্রেফতার করা হয়; ’৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে প্রথমে সামরিক গোয়েন্দা দফতরে, পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, তারপর সিলেট কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়; ’৮৪ সালে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও পরে কুমিল্লা কারাগারে আটক রাখা হয়; ’৮৭ সালে ভোলায় গ্রেফতার করে বরিশাল কারাগারে আটক রাখা হয়। ’৯৫-৯৬-এ ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যে আন্দোলন হয়, তাতে খালেদা জিয়ার আমলে তিনি রাজশাহী কারাগারে বন্দী ছিলেন। এ ছাড়া ২০০২-এ খালেদা-নিজামী জোট সরকারের শাসনামলে সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট থানায়, পরে কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডমে সেলে ১২ দিন আটক রেখে সেখান থেকে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। রাজনৈতিক জীবনে সর্বমোট সাতবার তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগার- ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, কুমিল্লা ও সিলেটে অন্তরিন ছিলেন। এর মধ্যে সর্বমোট তিনবার তাকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো স্বৈরশাসক তাকে কারাগারে আটক রাখতে পারেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় আদর্শ- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নে নিবেদিতপ্রাণ তোফায়েল আহমেদের মূলমন্ত্র ‘অসত্যের কাছে কভু নত নহে শির, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর’।

২০০১-এর ১ অক্টোবরের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের ষাড়যন্ত্রিক কর্মকান্ডে  তার অনুকূলে প্রাপ্ত নির্বাচনী রায় ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ নির্বাচনের পর দেশব্যাপী খালেদা-নিজামীর সরকার সংখ্যালঘু জনসাধারণসহ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর প্রচ  অত্যাচার-নির্যাতন করে। বিশেষ করে ভোলায় এ নির্যাতনের মাত্রা ছিল ভয়াবহ! এর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন এবং চারদলীয় জোট ও ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’বিরোধী আন্দোলনে গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ২০১০-এ তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম লীর সদস্য নির্বাচিত হন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং সাফল্যের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি ভোলা-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে পুননির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিম লীর সাবেক সদস্য, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপক সংগ্রাম ও বিস্তর বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। আজও তিনি তার সংগ্রামী জীবনে সততা, মেধা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও বাগ্মিতার ফলে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জনকল্যাণমূলক রাজনীতির অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন। ’৭৫-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে দল ও মতাদর্শ পরিবর্তনের চরিত্র অনেকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও তোফায়েল আহমেদ কখনই প্রলোভন ও হুমকির সামনে কোনো দিন মাথা নত করেননি। এমনকি ১/১১-এর পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে স্ত্রী-কন্যাসহ মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছেন। কিন্তু নতি স্বীকার করেননি। জেল-জুলুম-হুলিয়া তার রাজনৈতিক জীবনের প্রধান অলঙ্কার। ছাত্রাবস্থা থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনায় তিনি সততই অবিচল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে শুধু দেশের মানুষের কাছে নয়, সমগ্র বিশ্বেই বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক হিসেবে তিনি পরিচিত। জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ও সংসদীয় গণতন্ত্র অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে একই আদর্শে ও দলে ধারাবাহিকভাবে থেকে ‘রাজনৈতিক ইন্টিগ্রিটি’ বজায় রাখার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। এলাকার রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দিরসহ শিক্ষা, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছেন এবং অনাগত দিনে গোটা ভোলা জেলাসহ স্বাধীন বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করার মহতী স্বপ্ন দেখেন তিনি।

বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী তোফায়েল আহমেদের মাতৃভক্তি নজিরবিহীন। ভোলার বাংলাবাজারে তার মায়ের নামে তিনি স্থাপন করেছেন ‘ফাতেমা খানম কমপ্লেক্স’। সেখানে স্থাপিত হয়েছে ফাতেমা খানম গার্লস হাই স্কুল; ফাতেমা খানম ডিগ্রি কলেজ; ফাতেমা খানম মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র; ফাতেমা খানম শিশু পরিবার; ফাতেমা খানম জামে মসজিদ; ফাতেমা খানম বৃদ্ধাশ্রম। এখন কাজ চলছে আজহার-ফাতেমা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নবীন প্রজন্মের কাছে সমুন্নত রাখতে এই কমপ্লেক্সে তিনি আরও প্রতিষ্ঠা করেছেন দৃষ্টিনন্দন ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’। যে জাদুঘরে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ও ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায় দেয়ালগাত্রে সংরক্ষিত আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বের বহুবিধ আলোকচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও দলিলপত্র; যাতে প্রতিফলিত হয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, মহান ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন, ’৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলায় জাতির জনকের নেতৃত্বে বীর বাঙালির ভূমিকা। আরও আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান ও বরেণ্য নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দুর্লভ সব স্থির ও প্রামাণ্যচিত্র। এককথায় বলতে গেলে, নতুন প্রজন্মের যে কেউ জাদুঘরটি পরিদর্শন করলে তার ইতিহাস দর্শন হবে সুনিশ্চিত। ভোলার বাংলাবাজার পরিদর্শনরত দর্শনার্থীরা মনে করেন তোফায়েল আহমেদ কর্তৃক স্থাপিত এ কমপ্লেক্সটির কারণেই এটি একটি সুন্দর শহরে পরিণত হয়েছে। ভোলার মাটি ও মানুষের প্রিয় সন্তান তোফায়েল আহমেদ সেখানে দলমতের ঊর্ধ্বে সবার শ্রদ্ধার আসনেই বসেননি, তিনি উন্নয়নে জলের ভিতর থেকে তুলে এনে সাজিয়েছেন দ্বীপজেলা ভোলাকে। তিনি ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ ইয়েমেন, ইরাক, মিসর, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, কাতারসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সফর করেছেন। রাজনীতি ছাড়াও ব্যক্তিগত চরিত্র ও আচরণে অমায়িক এই সংগ্রামী রাজনীতিকের পরোপকার, বদান্যতা, সাহিত্য-সংগীত ও সুকুমার শিল্পের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তার মনন ও চেতনাকে মহিমান্বিত করেছে। তোফায়েল আহমেদ দম্পতির একমাত্র কন্যা তাসলিমা আহমেদ জামানের একমাত্র ছেলে ‘তানজিন আহমেদ জামান প্রিয়’ বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত। আর ছেলে মইনুল হোসেন বিপ্লবের দুই কন্যা ‘মালিহা আহমেদ প্রিয়ন্তী’ দ্বিতীয় শ্রেণিতে ও ‘মার্নিয়া আহমেদ শ্রাবন্তী’ নার্সারিতে পড়ছে। ব্যক্তিগত জীবনে এদের নিয়েই তিনি সুন্দর সময় অতিবাহিত করেন। দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবনে বিস্তর ঘাত-প্রতিঘাত থাকলেও পারিবারিক মূল্যবোধে তোফায়েল আহমেদ পরিবার একটি সুখী পরিবার। জননেতা তোফায়েল আহমেদের আজকের এই বিশেষ দিনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে যোগাযোগ : [email protected]


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর