শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৫

গণরোষে রাঙ্গা, দায় নিচ্ছে না দল

হারাতে পারেন দলের মহাসচিব ও চিফ হুইপ পদ, চাইলেন নিঃশর্ত ক্ষমা

শফিকুল ইসলাম সোহাগ

গণরোষে রাঙ্গা, দায় নিচ্ছে না দল

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক শহীদ নূর হোসেনকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেওয়ায় তীব্র গণরোষের মুখে পড়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তার এ বক্তব্যের দায় নিচ্ছে না খোদ জাতীয় পার্টিও। সংসদের দায়িত্বশীল পদে থাকার নৈতিকতা হারিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে তোপের মুখে গতকাল নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন রাঙ্গা। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ রাঙ্গাকে সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তোফায়েল আহমেদের সূর ধরেই জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রাঙ্গা জাতীয় সংসদে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের  বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটাক্ষ করলে কাউকে ক্ষমা করা হবে না। বাংলাদেশের জনগণও এক্ষেত্রে কাউকে ক্ষমা করবে না। তিন দিন ধরে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। জাতীয় পার্টির ভিতরে-বাইরে আলোচনা চলছে মহাসচিব পদ থেকে রাঙ্গাকে সরিয়ে দেওয়ার। হারাতে পারেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পদও। গত রবিবার বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘নূর হোসেন ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর ছিলেন।’ এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও কটাক্ষ করে বক্তৃতা করেন সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গা। তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। নূর হোসেনের মা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ করেন। রাঙ্গার নিজ শহর রংপুরেই চার দিনব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ। গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ছিল উত্তপ্ত। সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির এমপিরা রাঙ্গার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, মসিউর রহমান রাঙ্গা যে কটূক্তি করেছেন, তা শিষ্টাচারবহির্ভূতই কেবল নয়, এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানিয়েছে, রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে ঘরে-বাইরে চাপের মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, রাঙ্গার ব্যক্তিগত বক্তব্যের দায়ভার জাতীয় পার্টি নেবে না। রাঙ্গাকে মহাসচিবের পদ থেকে অপসারণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোনো সময়ে ঘোষণা আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এটা জাতীয় পার্টির বক্তব্য নয়। মহাসচিবের পদ থেকে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে পরিবর্তন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জি এম কাদের বলেন, আমরা কারও চাপে দলের মহাসচিব পরিবর্তন করব না। মহাসচিব পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাঙ্গার বিতর্কিত বক্তব্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে জাতীয় পার্টি। এ নিয়ে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তর থেকেই তার পদত্যাগের দাবি উঠতে শুরু করেছে। তারা বলছেন, জাপার মহাসচিব পদ থেকে রাঙ্গার বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিজ দলের মহাসচিব এখন দলের জন্য বিষফোঁড়া। সূত্র জানায়, রাঙ্গাকে সরিয়ে রওশন এরশাদের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমামকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাতীয় পার্টির সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিতর্কের ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার কারণেই আমি সংসদ সদস্য।

রংপুরে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র সংগঠনের মানববন্ধন : আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানান, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল দুপুরে নগরীর কাচারি বাজারে ’৯০-র স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে অংশ নেওয়া সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনের ডাকে মানববন্ধন হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গকারী নূর হোসেনের চরিত্র হনন করে বক্তব্য দিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গা এ জাতির হৃদয়ে আঘাত করেছে। তার বক্তব্যে গোটা জাতির হৃদয় থেকে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। তাই তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। এ জন্য রাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাফিয়ার রহমান সাফির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিজু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু তুষার কান্তি ম ল, সহ-সভাপতি নওশাদ রশীদ, মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাবেক ছাত্রদল নেতা আনিছুর রহমান লাকু, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম প্রমুখ। এ সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, বাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সংসদে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন রাঙ্গা : স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কটূক্তির দায় স্বীকার করে সংসদে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চাইলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। গতকাল জাতীয় সংসদে তিনি ক্ষমা চান।

রাঙ্গা বলেন, আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইছি। সমস্ত দোষ আমার ঘাড়ে নিলাম। আমি করজোড়ে তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। যারা কলিগ আছেন তারা এটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। তবে রাঙ্গা শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে তার দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করতে গেলে সংসদ সদস্যরা সমস্বরে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান। জাতীয় পার্টির এ সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ রাঙ্গা দাবি করেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিতর্কিত কোনো মন্তব্য তিনি করেননি। নূর হোসেনের পরিবারের কাছে বিশেষ করে নূর হোসেনের মায়ের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। রাঙ্গা বলেন, আমি নূর হোসেনের পরিবারের কাছে, তার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে পত্র দিয়েছি। আমি ভুল করেছি। এ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছি, বিবৃতি দিয়েছি। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমার দল ক্ষমতায় এলেও আমি মন্ত্রী হতে পারতাম না। প্রধানমন্ত্রী আমাকে মন্ত্রী করেছেন। অনেক স্নেহ করতেন, অনেক ভালোবাসতেন। আমি মনে করি সেই সম্পর্কটা আমার সঙ্গে তার থাকবে। তিনি বলেন, জাতির পিতাকে নিয়ে যদি আমি ভুল কিছু বলে থাকি সেজন্য আমাকে ক্ষমা করবেন মাননীয় স্পিকার।

গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রসঙ্গ টেনে রাঙ্গা বলেন, আমি ২০১৪ সালে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছি। গতকাল (মঙ্গলবার) উনারা আমার ব্যাপারে যেভাবে কথা বলেছেন আমি মনে করেছি উনারা আমাকে সচেতন করেছেন। আমি ভুল করেছি। আমাকে আপনারা শাসন করেছেন। সব দোষ আমার ঘাড়ে নিলাম। আমি নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।


আপনার মন্তব্য