শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:১২

বাজারজুড়ে অস্থিতিশীলতা

হঠাৎ চাল নিয়ে চলছে চালবাজি

প্রতিদিন ডেস্ক

হঠাৎ চাল নিয়ে চলছে চালবাজি

নতুন ধান ওঠার ভরা মৌসুমের আগে হঠাৎ করে চাল নিয়ে চালবাজি শুরু হয়েছে। যৌক্তিক কারণ ছাড়াই চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মিলাররা। সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি ৪-৬ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে মিলার সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ৫০ কেজির প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, মোকামে সব ধরনের চালের দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে মিলারদের কারসাজি রয়েছে বলে মনে করছেন জেলা বাজার কর্মকর্তাসহ খুচরা বিক্রেতারা। ছোট মিলারদের অভিযোগ, অটো মিল মালিকদের কারসাজিতে চালের দাম বাড়ছে। অপরদিকে মিল মালিকদের দাবি ধানের দাম বাড়ার ফলে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে। গত ১৫ দিনে কুষ্টিয়ার বাজারে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪-৬ টাকা। জেলার প্রতিটি মিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান ও চাল মজুদ থাকার পরও চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন কৃষি বিভাগ ও ভোক্তারা।

জানা যায়, গত সপ্তাহে মোটা থেকে সরু সব ধরনের চালের দাম ২-৩ টাকা বাড়ে, আবার এ সপ্তাহেও একইভাবে দাম বেড়েছে। ফলে গত ১৫ দিনে কুষ্টিয়ার বাজারে চালের দাম বেড়েছে ৪-৬ টাকা। আড়তদারদের দাবি, হঠাৎ করেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বিশ^াস অটো রাইস মিল ও খাজানগর মোকামের মিল মালিকরা সব ধরনের চালের দাম কেজিতে চার থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। মনিটরিং না থাকায় দেশের অন্যতম বড় মোকাম খাজানগরে এই মুহূর্তে সব চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

শহরের বড়বাজারের আড়তদার আজমল আলী বলেন, এক সপ্তাহ আগে মিল গেটে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৩৮ থেকে ৩৯ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৪ টাকায়। খুচরা বাজারে আরও দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কাজললতা ও বিআর-২৮ চালের দাম ৩২ থেকে ৩৩ টাকা বিক্রি হলেও এখন ৩৬ থেকে ৩৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের দামও কেজিতে দুই টাকা বেড়েছে। শহরের মঙ্গলবাড়িয়া বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী ফরিদুর রহমান বলেন, গত ১৫ দিন ধরে চালের দাম বাড়ছে। প্রথমে দৌলতপুরের বিশ^াস অটো রাইস মিলের মিনিকেট চালের দাম ৫-৬ বৃদ্ধি পায়। এরপর প্রতি সপ্তাহে ২-৩ টাকা করে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে।

খাজানগরে বর্তমানে ৪৪টি অটো মিল এবং হাসকিং মিল চালু রয়েছে দুই শতাধিক। তবে সব ব্যবসা অটো মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালকল মালিক জানান, কয়েক মাস ধরে চাল কেনাবেচা কম ছিল। অটো মিল মালিকদের গুদামে প্রচুর চাল জমে যায়। তাই আমনের নতুন ধান ওঠার আগেই সিন্ডিকেট করে তারা কেজিতে তিন থেকে চার টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়ে বিক্রি শুরু করেছেন। এ জন্য অন্য জেলা থেকে চালের অর্ডার দিলেও সংকট দেখিয়ে কম সরবরাহ করা হচ্ছে। কুষ্টিয়া জেলা বাজার কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে গত শনিবার থেকে কাজ শুরু করেছি। ধানের দাম বাড়ছে এটা ঠিক আছে, কিন্তু উনারা তো (মিলাররা) ধান এখন কেনেননি ধানটা বোরো মৌসুমে কিনেছেন। তাদের প্রয়োজনমতো মাঝারি এবং সরু ধান সেই সময়ে কিনেছেন। এখন যেটা কিনছেন সেটা খুবই নামমাত্র, আর এখনতো কৃষকের ঘরে ধানও নাই। চালের দামটা মূলত মিল থেকেই বাড়ছে বলে জানান তিনি। চালের দাম বেড়েছে ১৫ দিনের ব্যবধানে, তারা থেকে ৫-৬ টাকা বৃদ্ধি করেছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আমরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছি।

খুচরা বিক্রেতা ও আড়তদারদের অভিযোগ সম্পর্কে কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন সাধু বলেন, হ্যাঁ, মিল মালিকরা তো দাম বাড়াবেই, তারা বেশি দামে ধান কিনে, বেশি দামে চাল বিক্রি করেছে। আগে ৮-৯শ টাকায় এক মণ মিনিকেট ধান কিনে ১৯শ টাকায় (৫০ কেজির বস্তা) চাল বিক্রি করেছি। এখন ১১শ টাকায় এক মণ মিনিকেট ধান কিনে ২২শ টাকায় (৫০ কেজির বস্তা) চাল বিক্রি করছি। তবে সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, দেশের সবচেয়ে বড় ধান-চালের মোকাম ও সর্ববৃহৎ চাল উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁ থেকে দেশের চালের চাহিদার সিংহভাগ মেটানো হয়। এখানে পাইকারি ও খুচরাতে জিরাশাইল, মিনিকেট, কাটারিসহ বিভিন্ন জাতের চালের দাম বেড়েছে। সরু ও মোটা চালের দাম প্রকারভেদে প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারির দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় খুচরা বাজারেও। প্রকারভেদে প্রতি কেজি চাল ৪ থেকে ৫ টাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারের আমন ধান-চাল ক্রয়ের ঘোষণাও বাজারে ধান ও চালের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

শহরের আলুপট্টি ও গোস্তহাটির চালের খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, মোকামগুলোতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সরু চালের দাম প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে যে জিরাশাইল চাল প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়, তা এখন ২ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল আগে ছিল ১ হাজার ৭৫০ টাকা এখন ২ হাজার টাকা। আগে কাটারি প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩৫০ টাকায় এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (স্বর্ণা-৫, হাইব্রিড স্বর্ণা) দাম প্রতি বস্তায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি স্বর্ণা-৫ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়, যা আগে ছিল ৩০ টাকা। জিরাশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৪ টাকায় যা আগে ৪০ টাকা, কাটারিভোগ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা যা আগে ছিল ৫০ টাকা, মিনিকেট আগে ছিল ৪৫ টাকা আর বর্তমানে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁ পৌর বাজারের চাল ব্যবসায়ী কিরণ ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী মোহন সরকার বলেন, চালের প্রকারভেদে প্রতি কেজি চার থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোকাম থেকেই খুচরা ব্যবসায়ীদের আগের চেয়ে প্রতি বস্তা চাল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই খুচরাতেও দাম বেড়েছে। 

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান : অন্যতম ধান উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরের বাজারে হঠাৎ চালের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ২ থেকে ৩ টাকা। কোনো কারণ ছাড়াই দিনাজপুরের বাজারে চালের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। মিলারদের কাছে পর্যাপ্ত চাল মজুদ থাকার পরেও সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়ানোর অভিযোগ করছেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, এটা মিলারদের কারসাজি। এ ধরনের দাবি কোনোমতেই যৌক্তিক নয় বলে পাল্টা মন্তব্য করেছেন চালকল মালিক গ্রুপের নেতারা।

জানা যায়, বাজারে প্রকারভেদে ৫০ কেজির প্রতি বস্তায় বেড়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। ৫০ কেজির বস্তায় ২৮ সিদ্ধ চাল আগে বিক্রি হতো ১৬৩০ টাকায় এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭৪০ থেকে ১৮০০ টাকায়, ২৯ সিদ্ধ চাল প্রতিবস্তা ১৪৫০ থেকে বেড়ে ১৭০০ টাকায়, গুটি স্বর্ণা প্রতি বস্তা ১৫০০ থেকে বেড়ে ১৫৫০ টাকা, মিনিকেট ১৯০০ থেকে বেড়ে ২১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিনি গুড়া প্রতি বস্তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০০০ টাকায়। কাটারি চাল দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী জানান, রাজশাহীর বাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে বাড়তি চালের দাম। প্রতি কেজি চালের দাম এখন তিন থেকে পাঁচ টাকা বেশি। দাম বৃদ্ধির বিষয়ে খুচরা চাল ব্যবসায়ীরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের দায়ী করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বোরো মৌসুমের ধান শেষের দিকে। এ কারণে ওই চালের দাম বাড়ছে। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের কোনো সংকট নেই। আড়তদার ও মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে ধান মজুদ করে চালের দাম বাড়িয়েছে। সরকারিভাবে আমন ধান কেনার ঘোষণা দেওয়ার পরই মূলত সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা দুই দফা চালের দাম বাড়িয়েছে।

চালের দাম যেন আর না বাড়ে : খাদ্যমন্ত্রী, নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা জানান, চালের দাম যাতে আর কোনোভাবে না বাড়ে সে জন্য মিল মালিকদের হুঁশিয়ারি করেছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। রবিবার খাদ্য ভবনে চালকল মালিকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের খাদ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান অবস্থা থেকে চালের দাম আর বাড়বে না। আমাদের ধান উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ চাল মজুদ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা ৬ লাখ মেট্রিকাটন চাল কৃষকের কাছ থেকে কিনছি। কৃষক যাতে কোনো হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চালের মান যাতে খারাপ না হয় সে ব্যাপারেও বলা হয়েছে। সেটা হলে গ্রহণ করা হবে না।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর