শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৪১

দিনভর নৈরাজ্য, রাতে ধর্মঘট প্রত্যাহার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত মালিক-শ্রমিক নেতাদের বৈঠক, লাইসেন্স ফিটনেস সনদ আপডেটে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময়, আইন সংশোধনে সুপারিশ করা হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

দিনভর নৈরাজ্য, রাতে ধর্মঘট প্রত্যাহার
নবজাতককে নিয়ে বিপাকে পরিবারের সদস্যরা। প্রাইভেট গাড়ির চালকদের শরীরে পোড়া পেট্রোল ছিটিয়ে দেন পরিবহন শ্রমিকরা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

দিনভর নৈরাজ্যের পর গত রাতে ধর্মঘট প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। আজ থেকে সারা  দেশে স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলবে।

গতকাল দূরপাল্লার কোনো বাস চলাচল করতে পারেনি। বিভিন্ন জেলার সড়ক-মহাসড়কে পরিবহন শ্রমিকরা ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখেন। রাস্তায় অন্যান্য যানবাহন চলাচলেও তারা বাধার         সৃষ্টি করেন। নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে গাড়ি আটকে চাবি ছিনিয়ে নেন পরিবহন শ্রমিকরা। চালকের মুখে পোড়া মবিল মেখে দেন তারা। অ্যাম্বুলেন্সও তাদের এই ধর্মঘটে ছাড় পায়নি। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর করেন তারা। ঢাকার তিনটি বাস টার্মিনাল গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ থেকেও দূরপাল্লার এবং আন্তজেলার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিবহন শ্রমিকদের এই ধর্মঘট সড়ক-মহাসড়কে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবহন না পেয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বিভিন্ন রুটের যাত্রীদের। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে গত গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। পরে  সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তারা ধর্মঘট প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা তাদের ৯ দফা নিয়ে আলোচনা করেছি। লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ আপডেটের জন্য তাদের ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আইন সংশোধনের দাবি বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলব। এর আগে রাত ৯টার পর মন্ত্রীর ধানমন্ডির বাড়িতে এ  বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম, বিআরটিএ কর্মকর্তারাও ছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মঘট আহ্বানকারী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতাদের মধ্যে বৈঠকে থাকেন রুস্তুম আলী খান, তাজুল ইসলাম, মকবুল আহমেদসহ অন্তত ১০ জন। বাসমালিক সমিতির নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবি তুলে  দেশের পরিবহন সেক্টরে ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য শুরু হয় গত  সোমবার। সেদিন ১৪ জেলায় বাস চলাচল বন্ধ ছিল। সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে চালকের ফাঁসি হবে, এমন গুজব ছড়িয়ে গত মঙ্গলবার দেশের ২০টি জেলায় পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি আরও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। গতকাল এই ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ে প্রায় সারা দেশে। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। গতকাল সকাল থেকেই সবকটি বাসস্ট্যান্ড এবং সড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের বাসের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। গণপরিবহন না পেয়ে অনেকে রিকশায়, ভ্যানে বা বিকল্প ব্যবস্থায় নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছান। তবে কর্মবিরতির প্রথম দিনেই বেপরোয়া ছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের পাশাপাশি সাধারণ যানবাহনও আটকে দিয়ে হয়রানি করেছেন তারা। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। অবরোধের আওতায় কোনো ধরনের পরিবহনকেই এ পথে চলতে দেননি তারা। ছোট-বড় পিকআপ ভ্যান, লেগুনাও আটকে দেওয়া হয়। ঢাকার তিনটি বাস টার্মিনাল গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ থেকেও দূরপাল্লার এবং আন্তজেলার বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট ও খুলনা অঞ্চলে বাসযাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এদিন রাজধানীর প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তাটিও ছিল প্রায় ফাঁকা। ছোটখাট সমাবেশ আর মানববন্ধনে এ স্থানটিতে যানজট নিত্য দিনের ঘটনা। জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুযায়ী, যাত্রী দুর্ভোগের চিত্র সারা দেশে ছিল একই রকম। বিভিন্ন জেলার পরিবহন ধর্মঘটের খবর তুলে ধরা হলো। কাঁচপুর ও সাইনবোর্ড থেকে প্রতিনিধি জানান, বুধবার সকাল ৬টা  থেকে টানা ৮ ঘণ্টা জনদুর্ভোগের পর দুপুর ২টায় অবরোধ তুলে নিয়েছেন শ্রমিকরা। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকা দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৩৭টি জেলার গণপরিবহন প্রবেশ করে। ধর্মঘট তুলে নেওয়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কে শুরু হয় যান চলাচল। এ ছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড দিয়ে শহর থেকেও শুরু হয় যান চলাচল। তবে টানা ৮ ঘণ্টা অবরোধের কারণে লাখ লাখ মানুষকে চরম ভোগান্তি আর দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। আন্দোলনরত শ্রমিকরা বিভিন্ন পরিবহনের চালকদের লাঞ্ছিত করেন। কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক গাড়ি চালকদের মুখে ও গাড়িতে পোড়া মবিল মেখে দেন। গাড়ির চাবি কেড়ে নিয়ে হুমকি দেওয়া হয় ধর্মঘটে গাড়ি চালানো যাবে না। কেউ আদেশ অমান্য করে গাড়ি চালালে চিহ্নিত করে সেই গাড়ি চালককে কোথাও কোনো পরিবহনে চাকরিতে নেওয়া হবে না। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীরা চাষাঢ়া বাস টার্মিনালে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করেন। কোনো বাস থাকায় অনেকেই বাসায় ফিরে যান। আর যারা জরুরি প্রয়োজনে বের হয়েছেন তাদের কেউ ট্রেনের জন্য আবার কেউ হেঁটে রওনা হন কিংবা রিকশায়। সিএনজি অটোরিকশা চলাচলেও বাধা দিতে দেখা যায় শ্রমিকদের। শুধু প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা ও লেগুনা চলাচল করতে দেখা যায়।

 

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল সোয়া ৬টা থেকে কাঁচপুর এলাকায় এক দল পরিবহন শ্রমিক সড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে গাড়িগুলোকে এলোমেলো করে রেখে রাস্তা অবরোধ করে রাখেন তারা।

এই অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নাটোর প্রতিনিধি জানান, পার্শ্ববর্তী জেলা বগুড়া, পাবনা, নওগাঁ ও রাজশাহীসহ সারা দেশে শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘটের কারণে নাটোরেও বন্ধ হয়ে যায় সব রুটের যান চলাচল। আন্ত উপজেলা রুটগুলোর মধ্যে নাটোর-লালপুর ও নাটোর-রাজাপুর রুটে কয়েকটি গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে।

 চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এখানে শ্রমিকদের অঘোষিত ধর্মঘটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নওগাঁসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সব রুটেই বাস চলাচল বন্ধ থাকে। সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ভারত থেকে মালামাল এলেও ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাস না পেয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মাহেন্দ্রতে যাতায়াত করেন সাধারণ যাত্রীরা। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অঘোষিত ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়ে পুরো সিরাজগঞ্জ। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্ধ থাকায় কাঁচামাল ব্যবসায়ীদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। এ ছাড়াও শ্রমিকরা মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে বিক্ষোভ ও জেলার বাইর থেকে আসা পণ্যবাহী গাড়ি আটকে দেন। টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, গত দুই দিন সীমিত আকারে যান চলাচল করলেও গতকাল সকাল ১০টা থেকে পুরোপুরি ধর্মঘট পালন করেছেন টাঙ্গাইলের পরিবহন শ্রমিকরা। এতে টাঙ্গাইলের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। শেরপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে শহরের বাগরাকসা ও নবীনগরে দুটি বাস টার্মিনাল থেকেই ঢাকা-শেরপুর ও উত্তরবঙ্গসহ সব রুটের কোনো বাস চলাচল করতে দেখা যায়নি। দু-একটি সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করলেও পরে তা বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। এমনকি বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসও। চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, গতকাল চুয়াডাঙ্গায় তৃতীয় দিনের মতো অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট পালন করেন পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। সকাল থেকে অসংখ্য যাত্রী টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড ও কাউন্টারগুলোতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ফিরে গেছেন। কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, গত শুক্রবার থেকে কুষ্টিয়ায় সব ধরনের যানবাহন বন্ধ রেখেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। গত কয়েকদিন শুধু অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখলেও গতকাল দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়। নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, নরসিংদী থেকে ঢাকাগামী সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ থাকে। তবে টঙ্গী-মহাখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে বাস চলাচল স্বাভাবিক  ছিল। বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখায় গতকাল সকাল ১০টায়  নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং সড়কে নরসিংদী মেঘালয় পরিবহনের একটি বাসের চালক ও হেলপারকে মারপিট করেন শ্রমিকরা। এ সময় তারা গাড়ির গ্লাসও ভেঙে ফেলেন। ঘটনার পরপরই এর প্রতিবাদে নরসিংদী থেকে ঢাকার উদ্দেশে সব বাস চলাচল বন্ধ করে দেন মালিক ও শ্রমিকরা। বগুড়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল বগুড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, আন্ত থানা টার্মিনাল, কোচ টার্মিনাল থেকে কোনো যানবাহন বের হয়নি। সকালে কিছু গাড়ি টার্মিনাল থেকে বের হলেও সেগুলো শেরপুর উপজেলা সীমানা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকরা। অনেক শ্রমিক গাড়ির চাবি মালিকের কাছে জমা দিয়েছেন। দু-একটি গাড়ি চলাচল করলেও দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হয় যাত্রীদের কাছ থেকে। কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে কুমিল্লা। গতকাল নগরীর শাসনগাছা, জাঙ্গালিয়া ও চকবাজার বাসস্ট্যান্ডে হাজার হাজার যাত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার অংশে দুই একটা মালামাল আনা-নেওয়ার কাজে ট্রাক দেখা গেলেও চোখে পড়েনি কোনো যাত্রীবাহী পরিবহন।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল বেলা ১টার পর হঠাৎ এখানকার শ্রমিকরা অভ্যন্তরীণ সড়ক ও আন্তজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে ঢাকার উদ্দেশে কয়েকটি বাস ছেড়ে যাওয়ার পর কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় পরিহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে সেগুলো। পরে বাসগুলো সেখানে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আসে। ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, গতকাল ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে ঝালকাঠি-বরিশাল, ঝালকাঠি-ঢাকাসহ অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার ৯টি রুটে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ থাকে।


আপনার মন্তব্য