শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৫৬

পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে লুকোচুরি

গাবতলী মহাখালী থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়েনি, জেলায় জেলায় অঘোষিতভাবে যাত্রী জিম্মি কোনো আইনের আওতায় নারাজ চালকরা, ইন্ধনে সরকারি দলও রয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে লুকোচুরি

নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়ন ঠেকাতে ডাকা পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে চলছে লুকোচুরি। প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও শুধু ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল শুরু হয়েছে। কিন্তু যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে অঘোষিত ধর্মঘট চলছে জেলায় জেলায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর মালিকদের একটি পক্ষ বাস চালাতে চাইলেও তাতে সাড়া নেই পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠনের। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কিছু বলা না হলেও গোপনে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কঠোর নির্দেশনা  দিয়ে যাচ্ছেন শীর্ষস্থানীয় নেতারা। ফেডারেশনের বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত ছাড়া ধর্মঘট প্রত্যাহারে রাজি নয় সরকার সমর্থকদের বড় একটি অংশও। ফলে মুখে ধর্মঘট প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও যাত্রী পরিবহনের ভোগান্তি কমেনি। কিছু অঞ্চলে নির্দিষ্ট পরিবহন কোম্পানির দূরপাল্লার বাস স্বল্প পরিমাণে চলাচল করলেও অনেক যাত্রীই টার্মিনালে এসে বাস না পেয়ে দুর্ভোগে পড়েন।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অঘোষিত এই ধর্মঘট প্রত্যাহার হবে না চলতেই থাকবে সে বিষয়ে মূল সিদ্ধান্ত দেবেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি শাজাহান খানের নেতৃত্বেই গতকাল সকাল ১১টা থেকে সেগুনবাগিচায় সারা দেশ থেকে আসা শ্রমিক নেতাদের নিয়ে শুরু হয়েছে ফেডারেশনের বর্ধিত সভা। আজ শুক্রবার ফেডারেশন সভাপতি শাজাহান খান বসবেন পরিবহন মালিকদের সঙ্গে। এরপরই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে এই অঘোষিত ধর্মঘটের বিষয়ে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুসারে, বুধবার রাতে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হলেও গতকাল খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, নাটোর, জামালপুর, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইলসহ অনেক জেলায় বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এসব জেলায় দূরপাল্লার কোনো বাসও ছেড়ে যায়নি। রাজশাহী-ঢাকা রুটে বাস ও ট্রাক ছেড়ে গেলেও রংপুর, গাইবান্ধা এবং দক্ষিণাঞ্চলের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন রুটের পরিবহন রাজশাহীতে যায়নি এবং সেসব রুটে রাজশাহী থেকেও কোনো পরিবহন যায়নি। খুলনা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, টাঙ্গাইল জেলা থেকে কোনো বাস-ট্রাক চলছে না। সকালে ঢাকা থেকে এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে বিভিন্ন রুটের বাস ছেড়ে গেলেও ত্রিশাল, ভালুকা, গাজীপুরসহ বিভিন্নস্থানে শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে। কোথাও কোথাও চালক ও স্টাফদের মুখে কালি মেখে দিয়ে হেনস্তা করা হয়। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী এনা পরিবহনের গাড়িগুলোর চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও অন্য সার্ভিসের গাড়ি চলছে থেমে থেমে। সকাল থেকে দুই দফা গাড়ি বন্ধ থাকার পর আবার চলাচল শুরু হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর গাবতলী ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে হাতে গোনা কয়েকটি বাস ছেড়ে গেছে। বেশিরভাগ দূরপাল্লার বাসই ছিল বন্ধ। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের শ্রমিক নেতারা বলছেন, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান শ্রমিকরা আশ্বাস পেলেও বাস শ্রমিকদের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বাস শ্রমিক নেতাদের অনেকেই নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লিখিত প্রতিশ্রুতি দাবি করেন। চালক শ্রমিকদের ভাষ্য, নতুন আইনে পরিবর্তন না এলে গাড়ি নিয়ে তারা নামবেন না সড়কে। সেই সঙ্গে বিআরটিএ কার্যালয়ে হয়রানি বন্ধেরও দাবি তাদের। লাইসেন্স নবায়ন, গাড়ির ফিটনেস ইত্যাদি নিয়ে আপত্তি না থাকলেও মূলত জরিমানা কমানোর দাবিই মুখ্য তাদের। সোলায়মান নামে এক চালক বলেন, ‘ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে গাড়ি চালাব না। কোনো শ্রমিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে গাড়ি চালাবে না।’ তবে হবিগঞ্জ জেলা মোটর মালিক গ্রুপের সদস্য সচিব সম্পাদক শংখ শ্রভ্র রায় জানান, এটা কোনো সংগঠনের কোনো ধর্মঘট নয়, চালকরা ভয়ে গাড়ি চলাচ্ছেন না। অঘোষিত এ ধর্মঘটে কারও ইন্ধনও থাকতে পারে। কুড়িগ্রাম জেলা মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. লুৎফর রহমান জানান, ট্রাক, ট্যাংকলরি, কাভার্ড ভ্যান শ্রমিকরা তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেও বাস শ্রমিকরা কেন ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছে আমরা মালিকরা তা জানি না। আর তারা আমাদের না জানিয়ে বুধবার সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে। খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম বলেন, খুলনায় কর্মবিরতি অব্যাহত রেখেছে চালক-শ্রমিকরা। নতুন আইনে দুর্ঘটনার জন্য চালকদের দায় নিতে হচ্ছে। চালকরা কাউকে ইচ্ছা করে হত্যা করে না। তারপরও তাদের শাস্তি হবে। এ কারণে নতুন সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করছেন। বাস চলাচলের ব্যাপারে দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী জানান, আমরা ঢাকায় মিটিং করছি। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের পর বলতে পারব। ঢাকায় ফেডারেশনের বর্ধিত সভায় উপস্থিত সিরাজগঞ্জের এক শ্রমিক নেতা জানান, গতকালের আলোচনায় নতুন সড়ক আইনের কোন অংশ থাকবে আর কোন অংশ থাকবে না, কোন অংশ শ্রমিকদের মানতে হবে, কোন অংশ সরকার পরিবর্তন করবে এগুলো নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। আমাদের কথাগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সভাপতি একটা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন।

‘কর্মবিরতির নামে রাষ্ট্রকে জিম্মি করা হয়েছে’ : কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট আহ্বান করে জনগণ ও রাষ্ট্রকে জিম্মি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দুজন লোক আওয়ামী লীগের নামধারী নেতা। একজন পাবনার ওয়াজউদ্দিন খান এবং আরেকজন সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। উনি এই সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি। আর এই সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট দক্ষিণ বঙ্গে ধর্মঘট আহ্বান করে বসে আছেন। ফেডারেশনের নেতা শাজাহান খান পর্দার আড়ালে চলে গেছেন এমন দাবি করে ইনসুর আলী বলেন, পর্দার আড়ালে গিয়ে ফেডারেশনের নামে ধর্মঘট না ডেকে, ইউনিয়নকে মেসেজ দিয়ে বলেছে ধর্মঘট করতে। আজকে যারা ধর্মঘট ডেকেছে, তারা বাংলাদেশের শ্রম আইনকে অবজ্ঞা করেছে। আমরা অবৈধ ধর্মঘট আহ্বানকারী সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানাচ্ছি।


আপনার মন্তব্য