রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা, জুলাই সনদ ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতা, গণভোট ইস্যু নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। এসব কারণে প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন নিয়ে। দলগুলোর পক্ষ থেকেও নির্বাচন নিয়ে করা হচ্ছে নেতিবাচক মন্তব্য। রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, সরকারের প্রতিশ্রুতি ঠিক থাকলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে হতে যাচ্ছে আলোচিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু তিন মাস বাকি থাকলেও সরকার রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারেনি। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে বাড়ছে খুনাখুনি। রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্যের কারণে বল এখন সরকারের কোর্টে। আবার সরকার ঠেলছে দলগুলোর কোর্টে। সঙ্গে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আলটিমেটামও দিয়েছে। কিন্তু সরকারের কোর্টে থাকা বল আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বলে জানান রাজনৈতিক দলের নেতারা। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তারা বলেন, উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ জলঘোলা করতে চাইছেন। নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘ করাই তাদের লক্ষ্য। আবার কেউ কেউ নিজেদের আখের গুছিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠছে বলে মন্তব্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াত তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে কিছুটা নির্বাচনের আবহ তৈরি হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে নানা সংশয় আর সংকট। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে নির্বাচনি প্রচারে এক নেতার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তোলপাড় তৈরি করেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। অন্যদিকে প্রার্থিতা ঘোষণা নিয়ে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব কারণে তৃণমূল পর্যায়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে।
জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দৃশ্যমান বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামনে আরও উদ্যোগের ঘোষণা আছে। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। কিন্তু ওই বৈঠক থেকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি।
এর মাঝেই ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের অধীনে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকা ৫০ শতাংশ সেনা সদস্যকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা আসে। আবার সে ঘোষণা প্রত্যাহারও করা হয়। এদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে গণভোট নিয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ নিয়ে ঝুলে রয়েছে ইস্যুটি। এ নিয়ে দলগুলো এখনো তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। সরকার বিষয়টি নমনীয়ভাবে দেখার আহ্বান জানালেও সাড়া দেয়নি কোনো রাজনৈতিক দল। উল্টো বিষয়টি নিয়ে সরকারের দিকে সমালোচনার তীব্র তির ছোড়া হয়েছে। এসব ইস্যু ক্রমেই জটিল থেকে আরও জটিলতর হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনের ডেটলাইনও এগিয়ে আসছে। আস্থার সংকটে প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন ঘিরে। প্রশ্ন উঠলেও আপাতত কারও কাছে সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া নানা সংকট ও প্রশ্ন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির কোনো সংশয় নেই। বিএনপি বিশ্বাস করে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই। তিনি বলেন, যারা মাঠে নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন, তারা কৌশলগত কারণে বলছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মাঝে মাঝে কিছু দলের পক্ষ থেকে সীমা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। নগর ভবন ঘেরাও হয়েছে। জুলাই সনদ সমস্যা সমাধানে জামায়াতের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও করা হয়েছে। কিন্তু দলগুলো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। এতে জনগণ স্পষ্ট হয়েছে- কারা সংস্কার চায় কারা চায় না। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে আমরা সরকারকে দর্শকের ভূমিকা থেকে সরে এসে রেফারির ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছি। এ জন্য সবচেয়ে সহজ সমাধান হচ্ছে-জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করা।
বিএনপির মিত্র দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যতটা উন্নতি করা হবে বলে আশা করেছিলাম সরকার সেটা করতে পারেনি। এসব মাথায় রেখেই এখন একমাত্র সমাধান হচ্ছে সঠিক সময়ে নির্বাচন। এটা না হলে এত বেশি সমস্যা হবে যেটা বহন করার শক্তি বা ক্ষমতা জনগণের থাকবে না। নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে যেন সরকার পা না দেয়। তারা যেন নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরি করে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। টানাপোড়েন রয়েছে। এখন বল সরকারের কোর্টে। সরকার কীভাবে সমাধান করে নির্বাচন করবে সেটা দেখার বিষয়।
একই প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচনি মাঠের পরিস্থিতি দেখছি অত্যন্ত আশঙ্কাজন। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ঘোরাফেরা করছে। অস্ত্র ঢুকছে। পেশিশক্তির প্রভাব বাড়ছে। এরই মধ্যে একজন প্রার্থী আক্রান্ত হয়েছে। আমরা যারা নির্বাচনে প্রার্থী তারাই শঙ্কিত। জনগণকে আশ্বস্ত করতে সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কিছু দেখছি না। নির্বাচন ঘিরে শক্ত পদক্ষেপ, অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান, এসব কিছুই করা হচ্ছে না সরকারের পক্ষে। জনগণকে ভোটের বুথ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ক্যাম্পেইন করা দরকার সেটা করা হচ্ছে না। পাশাপাশি গণভোট নিয়েও সরকারের কোনো ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এখন একটাই জিনিস বাকি আছে তা হলো বিভিন্ন দলের মধ্যে সহিংসতা, সংঘর্ষ। এটা যদি শুরু হয় তাহলে আমাদের সবার জন্যই বিপদ।