পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে দিনদুপুরে অস্ত্রধারীদের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন (৫৬) নিহত হয়েছেন। প্রায় ২৯ বছর আগের একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে গতকাল বেলা ১১টায় হাসপাতালের সামনে দুই অস্ত্রধারী তাকে ধাওয়া দিয়ে ফিল্মি স্টাইলে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই টিপু হত্যা মামলার আসামি। স্বজনরা জানিয়েছেন, মামুন আদালতে মামলার হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। আদালতের ঠিক উল্টো পাশেই ন্যাশনাল মেডিকেলের অবস্থান। সেখানেই তিনি হামলার শিকার হন।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্বের জের ধরে দিনদুপুরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে মনে করছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। এ অবস্থায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। পুলিশ ও গোয়েন্দারা বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তারিক সাঈদ মামুন একসময় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। পুলিশ বলছে, অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইমন ও মামুনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
নিহত মামুনের স্ত্রী রিপা আক্তার বলেন, আমার স্বামী বিএনপি সমর্থিত একজন কর্মী ও পাশাপাশি ব্যবসা করত। তার কোর্টে হাজিরা ছিল। আমরা জানতে পারি আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন। পরে ঢামেকে আমার স্বামীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাই। স্বামীকে হারিয়ে ভাঙা কণ্ঠে রিপা আক্তার বলেন, ইমন ছাড়া কেউ এ কাজ করেনি। কয়েক দিন আগে ইমনই লোক দিয়ে মামুনকে মারধর করেছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, নিহত ব্যক্তি তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইমন গ্রুপের শীর্ষ সন্ত্রাসী। আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছি। দ্রুত অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এর পেশকার মো. শাহিন বলেন, ২৯ বছর আগের একটা হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে সকালের দিকে আদালতে আসেন মামুন। সাড়ে ১০টায় বিচারক এজলাসে ওঠেন। একটা মামলার পরই তার মামলার ডাক আসে। তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাজিরা দেন। তবে এ মামলার কোনো সাক্ষী আসেনি। বিচারক আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করেন। বেলা পৌনে ১১টার দিকে আদালত ছেড়ে চলে যান মামুন।
এদিকে খুনের ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫৩ সেকেন্ডে মামুন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। তিনি দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে যান। এ সময় পেছন দিক থেকে দুজনকে অস্ত্র হাতে ধাওয়া করতে দেখা যায়। তারা খুব কাছে থেকে তাকে গুলি করছেন। ঘটনাটি ঘটে তিন থেকে চার সেকেন্ডের মধ্যে। এরপর দ্রুত তারা অস্ত্র কোমরের বেল্টে লুকিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী এক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, আমরা হাসপাতালের ভিতরের দিকে ছিলাম। দুর্বৃত্তরা একজনকে ধাওয়া করতে করতে হাসপাতালের গেটে এলে প্রথমে পায়ে গুলি করে। পরে তাকে আবার কয়েকটি গুলি করে। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আমি দ্বিতীয় তলায় ছিলাম। সেখান থেকে গুলির আওয়াজ শুনে বাইরে আসি। তখন দেখি একজন পড়ে আছে। তার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা যায়।
আরাফাত নামে আরেক ব্যক্তি জানান, গাড়ি থেকে নামলেই পেছন থেকে গুলি করেন দুই ব্যক্তি। তারা দুজনে মাস্ক ও রুমাল পরা ছিলেন। দুজনই লাল-কালো রঙের একটি মোটরসাইকেল থেকে নেমে গুলি করা শুরু করেন। পেছনের রাস্তায় পুলিশ ছিল, হাসপাতালের গেটে নিরাপত্তাকর্মীরা ছিল। গুলির আওয়াজ শুনে সবাই এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। প্রথম যখন গুলি করে, সে রাস্তার ওপর থেকে দৌড়ে ন্যাশনাল মেডিকেলের দিকে এগিয়ে আসতেছিল। মেইন গেট থেকে দুই-তিন ফুট সামনে গিয়ে পড়ে যায়। আশপাশের লোকজন হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা না করিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢামেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।
জানা গেছে, নিহত সাঈদ মামুন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। এর আগে দীর্ঘ ২৪ বছর জেল খাটার পর ২০২৩ সালে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় তাকে। সে সময় দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে ভুবন চন্দ্র শীল নামে এক পথচারী নিহত হন। মামুনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায়। তিনি সেখানকার মোবারক কলোনির বাসিন্দা। বাবা এস এম ইকবাল।
এদিকে ন্যাশনাল হাসপাতালের ওয়ার্ডমাস্টার মহিবুল্লাহ রহমান বলেন, বেলা ১১টায় গোলাগুলির শব্দ শুনি। এরপর সবাই হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এসে মামুন নামে ওই ব্যক্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি। প্রথমে তাকে ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে অবস্থার অবনতি হতে থাকলে সেখান থেকে দ্রুত ঢামেকে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
জানা গেছে, জাহিদ আমিন ওরফে হিমেল নামের ২৫ বছরের এক যুবককে ১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মোহাম্মদপুর পিসি কালচার হাউজিং এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। সেদিন হিমেলের বন্ধু সাঈদও আহত হন। এ ঘটনায় হিমেলের মা জাফরুন নাহার সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ২-৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর তারিক সাঈদ মামুনসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অপর আসামিরা হলেন ওসমান, মাসুদ ওরফে নাজমুল হোসেন, রতন, ইমন ও হেলাল। এ মামলায় গতকাল শুনানি ছিল। দ্রুত বিচার মামলা ৩৫/২০০৩-এ তিনি আদালতে হাজিরা দেন।