দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির অবস্থা সংকটাপন্ন। তাঁর মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হয়েছে। তবে হাদির কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা ফিরতে শুরু করেছে। গতকাল মেডিকেল বোর্ডের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমানে রোগীর (ওসমান হাদি) সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁর মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেহেতু সার্জিক্যাল হস্তক্ষেপ সম্পন্ন হয়েছে, তাই বর্তমানে তাঁকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হয়েছে। ব্রেন প্রোটেকশন প্রটোকল অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সব সাপোর্ট চালু থাকবে। তাঁর ফুসফুসেও ইনজুরি রয়েছে। চেস্ট ড্রেইন টিউব দিয়ে রক্ত নির্গত হওয়ায় তা চালু রাখা হয়েছে। ফুসফুসে সংক্রমণ ও এআরডিএস প্রতিরোধের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট অব্যাহত রাখা হবে। কিডনির কার্যক্ষমতা ফিরে এসেছে। এটি বজায় রাখতে ফ্লুইড ব্যালেন্স চালিয়ে যাওয়া হবে। পূর্বে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তক্ষরণের মধ্যকার অসামঞ্জস্য দেখা দিলেও বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ব্রেন স্টেম ইনজুরির কারণে রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন ওঠানামা করছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। হৃৎস্পন্দন বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে পেসমেকার স্থাপনের জন্য টিম প্রস্তুত রয়েছে। মেডিকেল টিম সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিবৃতিতে অপ্রয়োজনে হাসপাতালে ভিড় না করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ওসমান হাদির সুস্থতা কামনায় গতকাল মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। বিকালে ঢাবির বটতলায় এ মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। হাদির পরিবারকে প্রধান উপদেষ্টার আশ্বাস : ওসমান হাদির সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হামলায় জড়িত পুরো চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ওসমান হাদির পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আশ্বাস দেন। সাক্ষাৎকালে ওসমান হাদির ভাই আবু বকর সিদ্দীক ও বোন মাসুমার সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের তিন নেতা আবদুল্লাহ আল জাবের, ফাতিমা তাসনিম জুমা ও মো. বোরহান উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। ওসমান হাদির বোন বলেন, ‘সে ছোটবেলা থেকেই দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসত। ছোটবেলা থেকেই সে বিপ্লবী। তাঁর একটি ১০ মাসের সন্তান আছে। হাদি আমাদের মেরুদণ্ড। ওর অনেক কাজ, ওকে বেঁচে থাকতে হবে। আপনারা বিপ্লবী সরকার, যে করেই হোক জুলাই বিপ্লবীদের বাঁচিয়ে রাখবে হবে। তা না হলে এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে।’ অপরাধীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা জাবের বলেন, যে ছেলেটা গুলি করেছে, শুনতে পাচ্ছি সে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। কোন প্রক্রিয়ায় সে জামিন পেয়েছে তার তদন্ত প্রয়োজন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ওসমান হাদির সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিতে সবাই চেষ্টা করছেন। প্রয়োজন হলে তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে সরকার। এমন নৃশংস হামলার জড়িত পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ঘটনার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সন্ত্রাস বাড়ছে, সরকার শুধু সান্ত্বনার বাণী দিচ্ছে : ওসমান হাদির শরীরের খোঁজখবর নিতে গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে যান গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। পরে হাসপাতালের সামনে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি, এ কন্ডিশনে বেঁচে থাকার হার খুব নগণ্য। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নুর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসীদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি অনিরাপত্তায়। অথচ যারা আন্দোলনে ছিলেন না, তারাই রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। নুরুল হক নুর বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের পর একের পর এক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে। একটি ঘটনারও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। অতীতের মতো এবারও সরকার শুধু সান্ত্বনার বাণী দিচ্ছে। শেখ হাসিনাও এমন কথা বলতেন। শুধু আশ্বাস দিয়ে জনগণকে আর শান্ত রাখা যাবে না। এদিকে হাদির ওপর হামলার ঘটনায় আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘হাদি আমার সন্তানসমতুল্য। এ ঘটনায় আমি মানসিকভাবে আহত হয়েছি। এ আঘাত গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। যারা এ আঘাত করেছে তাদের কালো হাত ভেঙে দিতে হবে।’ গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ বিএনপি এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। নিষিদ্ধ বাহিনী হাদির ওপর হামলা করেছে দাবি করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুই-তিন দিন আগেও হাদির সঙ্গে কথা হয়েছে।
ওসমান হাদির বাড়িতে চুরি : ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটিতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার দিবাগত রাতে শহরের খাসমহল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওসমান হাদির চাচাতো ভাই সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, বাসায় কেউ না থাকার সুযোগে জানালা ভেঙে চোর ঘরে প্রবেশ করে। নলছিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম বলেন, জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে, কিছুদিন আগে ওসমান হাদির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকির সঙ্গে চুরির ঘটনার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।