ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টাকারী দুজন ভারতে পাড়ি জমিয়েছে বলে মনে করছে গোয়েন্দা সূত্র। সূত্রমতে, ঘটনার পর তারা ঢাকা থেকে কখনো বাস, কখনো প্রাইভেট কার, আবার কখনো মোটরসাইকেলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পৌঁছায়। সেখানে গ্রিন জোন রিসোর্ট নামে একটি হোটেলে বিশ্রাম নেয়। এরপর সীমান্তের পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায়।
এ সূত্রসহ তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকে হাদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে গতিবিধি নজরদারি করা, অস্ত্রের জোগান, গুলির জন্য বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকা বেছে নেওয়া, এরপর চারবার গাড়ি বদল করে সীমান্তে পৌঁছানো সবকিছুই ছিল সুপরিকল্পিত। পুরো মিশনে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে আট-১০ জনের একটি টিম। হামলাকারীদের সীমান্ত পার হতে সহযোগিতা করা পাচার চক্রের মূলহোতাও গ্রেপ্তারের ভয়ে ভারতে চলে গেছে।
তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য নেই। তারা যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বিজিবি এবং সব বন্দরকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন সীমান্তে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
ডিএমপি আরও জানায়, শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্তের পাচার চক্রের সদস্য সিবিয়ন দিও ও সঞ্জয় চিসিম নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রাতে ডিএমপির একটি সূত্র জানিয়েছে, হাদিকে গুলি করার ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এ ছাড়া আরও তিন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে র্যাব। সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, রাতে তাদের নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে ফয়সালের স্ত্রী সামিয়া ও শ্যালক শিপু এবং বান্ধবী মারিয়া। শুক্রবার হাদিকে গুলির আগে ও পরে তাদের সঙ্গে ফয়সালের ঘন ঘন ফোনে কথা বলার তথ্য পেয়েছেন তারা।
এদিকে তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, সিসিক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে নাম্বার প্লেটের সূত্র ধরে এটির মালিক আবদুল হান্নানকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে আদালতে পাঠিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকা মহানগর হাকিম মো. আবদুল হান্নান শুনানি শেষে তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এ ছাড়া গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে অভিযান চলছে। অভিযুক্তরা যাতে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে লোক পারাপারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে এবং এর মালিককে র্যাব আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
তিনি আরও জানান, অভিযুক্তদের কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছে কি না, এমন কোনো তথ্য এখনো ইমিগ্রেশন ডেটাবেজে পাওয়া যায়নি। ফয়সাল করিম মাসুদের সর্বশেষ বিদেশযাত্রার তথ্য অনুযায়ী, সে জুলাই মাসে থাইল্যান্ড থেকে দেশে প্রবেশ করে। এরপর তার দেশত্যাগের কোনো রেকর্ড নেই।
এদিকে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দেশের অভ্যন্তরে একাধিকবার সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্ত করা হলেও বারবার স্থান পরিবর্তনের কারণে এখনো তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি যাতে কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে সেজন্য শুক্রবার রাতেই দেশের সব ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে সন্দেহভাজনদের ছবি ও অন্যান্য তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। সীমান্তে বিজিবি ও র্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। এ হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনকে ইতোমধ্যে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়াও সন্দেহভাজনদের হাতের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে শুটার ফয়সাল করিম ও তার আইটি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল সফট আইটি লিমিটেডের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। গতকাল ব্যাংক হিসাব ফয়সাল করিম মাসুদ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সদস্য। তার মালিকানাধীন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপল সফট আইটি লিমিটেড’ কোম্পানিটি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ২০১৬ সালে তৎকালীন সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘ব্যাটল অব ’৭১’ নামে একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছিল ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকও ফয়সাল করিম মাসুদ।
হাদির অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক : রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওসমান হাদির অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া হতে পারে। এভারকেয়ারের সামনে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক আবদুল আহাদ জানান, হাদির অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে কার্যক্ষমতা বন্ধ হয়ে যাওয়া তার দুই কিডনি আবার সচল হয়েছে। ফুসফুসের কার্যক্রমও অপরিবর্তিত রয়েছে।
হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে আজ : মাথায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে আজ দুপুরে একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে। গতকাল রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান, এভারকেয়ার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জাফর ও ওসমান হাদির ভাই ওমর বিন হাদির মধ্যে এক জরুরি টেলিফোন কনফারেন্সে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
প্রেস উইং জানায়, প্রয়োজনীয় মেডিকেল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক দল এবং ভ্রমণসংক্রান্ত সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের অ্যাক্সিডেন্ট ইমার্জেন্সি বিভাগে তার চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের সাংবাদিকদের বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমান হাদিকে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ধার করে অর্ধকোটি টাকা জোগাড় করা হয়েছে।
দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি কঠোর কর্মসূচি ইনকিলাব মঞ্চের : ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেছেন, আমরা মনে করছি, রাষ্ট্রে যারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন, তারা রাষ্ট্রের যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দরকার, তা নিশ্চিত করতে পারছেন না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ‘আগামীকালের (সোমবার) মধ্যে ওসমান হাদির ওপর গুলি চালানো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা না হলে আমরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং আইন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছি।’ গতকাল রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। আল জাবের বলেন, ওসমান হাদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। একই সঙ্গে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শক্তির সবচেয়ে বড় জায়গায় পরিণত হয়েছিলেন। তাই, সরকারের দায়িত্ব ছিল হাদিকে রক্ষা করা। কিন্তু সরকার সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা আপনাদের ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলাম। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে আপনারা ওসমান হাদির খুনের চেষ্টাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেননি। ইনকিলাব মঞ্চ ও জনতার মতামতের ভিত্তিতে বলছি, ওসমান হাদি কোনো কারণে নিশ্বাস বন্ধ করলে, সেদিন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিন হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি, ‘আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি শ্রেণি উঠেপড়ে লেগেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে, ভারতের কোনো দাসত্ব মেনে নেওয়া হবে না। কোনো রাজনৈতিক দলকেও ভারতের পক্ষপাতি হতে দেওয়া হবে না। আগামীকাল থেকে আমরা সর্বাত্মক প্রতিরোধ পরিস্থিতি গড়ে তুলব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দিতে এলে সর্বোচ্চ জবাব দেওয়া হবে।’
ইনকিলাব মঞ্চের এ সদস্যসচিব বলেন, ‘আগামীকাল (সোমবার) ইনকিলাব মঞ্চের আয়োজনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বদলীয় এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। সব রাজনৈতিক দলকে এ সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তবে, যারা ভারতের তাবেদারি করে, তাদের আমরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না।’
সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের অন্য নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।