সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় শাহাদাতবরণকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয় শান্তিরক্ষী। আটজন শান্তিরক্ষী আহত হন। এতে জাতিসংঘ মহাসচিব, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শোক ও নিন্দা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
গতকাল আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেজে শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ৪০ থেকে ৩টা ৫০ মিনিটের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। এ হামলায় দায়িত্বরত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হন। তারা হলেন- করপোরাল মো. মাসুদ রানা, এএসসি (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, বীর (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা, বীর (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত মণ্ডল, বীর (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ), লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)। আহত শান্তিরক্ষীরা হলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান, পিএসসি, অর্ডন্যান্স (কুষ্টিয়া), সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন, বীর (দিনাজপুর), করপোরাল আফরোজা পারভিন ইতি, সিগন্যালস (ঢাকা), ল্যান্স করপোরাল মহিবুল ইসলাম, ইএমই (বরগুনা), সৈনিক মো. মেজবাউল কবির, বীর (কুড়িগ্রাম), সৈনিক মোসা. উম্মে হানি আক্তার, ইঞ্জি. (রংপুর), সৈনিক চুমকি আক্তার, অর্ডন্যান্স (মানিকগঞ্জ), সৈনিক মো. মানাজির আহসান, বীর (নোয়াখালী)।
আইএসপিআর জানিয়েছে, আহত আট শান্তিরক্ষীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে সৈনিক মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ইতোমধ্যে তাঁর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। আহত অপর সাতজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাঁরা সবাই শঙ্কামুক্ত। আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। শহীদ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় নিদর্শন হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এই হামলাকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কর্দোফানে আজকের হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর জন্য অবশ্যই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি এ ঘটনায় ‘গভীরভাবে মর্মাহত’ এবং এতে ছয়জন নিহত ও আটজন আহত হওয়ার কথা জানান। তিনি আহতদের জরুরি সহায়তা দিতে জাতিসংঘকে অনুরোধ করেন। পাশাপাশি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এ কঠিন সময়ে নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবে।’ বিবৃতিতে তিনি এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ। তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা আরও জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তারেক রহমান বলেন, জাতিসংঘের পতাকা তলে বিশ্বশান্তি রক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গকারী আমাদের বীর সেনাসদস্যরা জাতির গর্ব। তাদের এ আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের শোক প্রকাশ : সুদানে ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাতে গতকাল প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।
ফোনালাপে গুতেরেস বলেন, ‘আমি গভীর গভীর শোক প্রকাশ করতে ফোন করেছি। আমি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত।’ তিনি হামলার ঘটনায় গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ জানান, যেন তিনি নিহত শান্তিরক্ষীদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর কাছে তাঁর সমবেদনা পৌঁছে দেন।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রাণহানিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আহত সেনাদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তরের পাশাপাশি নিহতদের লাশ দ্রুত দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা গ্রহণে জাতিসংঘের সহায়তা কামনা করেন।
গুতেরেস জানান, আহত শান্তিরক্ষীদের প্রাথমিকভাবে সুদানের একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের উন্নত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে।
আহতদের চিকিৎসা ও সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নজর দেওয়ায় জাতিসংঘ মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানান প্রফেসর ইউনূস।
বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত এ ফোনালাপে প্রধান উপদেষ্টা মহাসচিবের গত রমজানে বাংলাদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন। এ সময় দুই নেতা বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়েও আলোচনা করেন। প্রফেসর ইউনূস গুতেরেসকে আশ্বস্ত করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করবে।