জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছে প্রসিকিউশন। গতকাল ৮টি যুক্তি তুলে ধরে তাদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রসিকিউশনের এ আপিল আবেদন দাখিল করা হয়েছে। পরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের বলেন, আপিল আবেদন দাখিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে এ আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটির পর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আপিলটি দ্রুত শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে। যেহেতু আইনে ৬০ দিনের কথা বলা আছে, আশা করছি তার আগেই আপিল বিভাগ এ আপিলটি নিষ্পত্তি করবেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ‘মৃত্যুদণ্ড’র কথা সরাসরি উল্লেখ থাকা, জুলাই অভ্যুত্থানে আসামিদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নৃশংস অপরাধ করা, নিরস্ত্র-নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় হামলা ও হামলা করে হতাহত করার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে আপিল আবেদনে। এ ছাড়া অপরাধের গুরুত্ব, আসামিদের অপরাধ বিবেচনায় সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, স্বেচ্ছায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামিদের পলাতক থাকা এবং পলাতক থেকে বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার মতো যুক্তি তুলে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে বলে জানান প্রসিকিউটর তামীম। এ মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এখন পর্যন্ত তার পক্ষে আপিল করা হয়নি বলে জানান এই প্রসিকিউটর।
গত বছর ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট সময়ের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট পাঁচ অভিযোগে ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ গঠন করে বিচার চলে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির। গত ১৭ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল জানান, অভিযোগ পুনর্বিন্যাস (রিফ্রেম) করা হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচটি অভিযোগকে একীভূত করে দুটি অভিযোগ করা হয়েছে। রায়ে প্রথম অভিযোগে তিনটি অপরাধমূলক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। ঘটনা তিনটি হচ্ছে- গত বছর ১৪ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপ। সেই ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের রাজাকার সম্বোধন করে তাঁদের ফাঁসিতে ঝোলানোর হুমকি, অপরাধ সংঘটনে অধীনস্থদের বিরত না করা এবং ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যা।
এ অভিযোগে শেখ হাসিনা ও কামালকে সাজা দেওয়ার ব্যাখ্যায় ট্রাইব্যুনাল বলেন, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা ও উসকানি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল দায়ী। এসব অপরাধে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো। এ সাজার বিরুদ্ধেই আপিল করার কথা জানালেন প্রসিকিউটর তামীম।
দ্বিতীয় অভিযোগে শেখ হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ অভিযোগে মামলার অন্য আসামি এবং রাজসাক্ষী সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।