সব অপশক্তির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্বাচনের আগে সহিংসতা ও চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শক্তি নির্বাচনের আগেই আবার ফিরতে চায়।
নানাভাবে তারা এই চেষ্টা করছে। এই চোরাগোপ্তা খুন তার একটা রূপ। আরও কঠিনতর পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুতি তাদের আছে। তাদের আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করব। পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি এ দেশের পবিত্র মাটিতে আর কোনো দিন ফিরতে পারবে না।
মহান বিজয় দিবস ২০২৫ উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত। সরকার এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে। যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পরাজিত ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, অপপ্রচার বা গুজবে কান দেবেন না। ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোকাবিলা করব। এ দেশের পবিত্র মাটিতে তারা আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত গড়ে তুলতে যে বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, দেশের আপামর জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা তার সফল পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছি।
তরুণদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, পলাতকরা বুঝে গেছে তরুণ যোদ্ধারা তাদের পুনরুত্থানের পথে বড় বাধা। এজন্য তারা নির্বাচনের আগেই পথের এই বাধাগুলি সরিয়ে ফেলে আবার নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। তাদের বন্ধুরা যত দিন তাদের সঙ্গে আছে তত দিন তারা এই স্বপ্ন দেখবে। নির্বাচন হয়ে গেলে তাদের বন্ধুরা সমর্থন জোগাতে বেকায়দায় পড়বে। সেজন্যই তো এত তাড়াহুড়া। নির্বাচনের আর বাকি মাত্র দুই মাস। আমরা তাদের ওপর নজর রাখব এবং বাকি দিনের প্রতিটি দিন উৎসবমুখর করে রাখব। আমাদের ভয়ডরহীন কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা নির্বাচনের আগের প্রতিটি মুহূর্তকে উৎসবমুখর করে রাখবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টিকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে তাঁকে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। পলাতক শেখ হাসিনা এবং এই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অপর আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনকে দেশে ফেরাতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। কয়েক ডজন পুরোনো আইন সংশোধন ও বেশ কয়েকটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সংস্কারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। এই সনদ বাস্তবায়নে নাগরিকদের মতামত নিতে আগামী সংসদ নির্বাচনের সময় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে নাগরিকরা হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দেবেন। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথরেখা এখান থেকেই সূচিত হবে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই ভোট হবে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা এবং দেশকে এগিয়ে নিতে সরাসরি অবদান। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের মালিকানা আপনাদের হাতে, আর সেই মালিকানারই স্বাক্ষর আপনার ভোট। মনে রাখবেন, ভোট রক্ষা করা দেশ রক্ষা করার সমান। ভোট দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গাড়ির চাকা। এই চাকা কাউকে চুরি করতে দেবেন না।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান বলেন, আপনারা একে অপরকে শত্রু হিসেবে দেখবেন না। নির্বাচনের মাঠে এমন একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
ভোটারদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যারা ভোট বাক্স ডাকাতি করবে তারা দেশের মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী। তাদের থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা আমাদের সবার কর্তব্য। ভোট দিতে কেউ বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিন। ভোটের ওপর নির্ভর করছে আপনার-আমার ভবিষ্যৎ। আপনার-আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ। তাই যোগ্য লোককে ভোট দিন। জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন। এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তাঁরাও খুশি, সরকারও এটা করতে পেরে খুশি বলে জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান বলেন, এবারের নির্বাচনটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই দিনে এবার দুটি ভোট। একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের ভোট। আরেকটি গণভোট-যার প্রভাব হবে শতবর্ষব্যাপী। আপনাদের ভোটই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র কোন পথে অগ্রসর হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা অত্যাবশ্যক। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে বিচার বিভাগকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সংস্কারের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বার্থান্বেষী নিয়োগের কারণে সাধারণ মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ গৃহীত হয়েছে।
দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা আজ এক নতুন ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। এই দেশ আমাদের, এই রাষ্ট্র আমাদের, এর ভবিষ্যৎও আমাদের হাতেই। এখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক অনুপ্রেরণা ধারণ করে জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যে নবযাত্রা সূচিত হয়েছে, তা এগিয়ে নেওয়াই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।