স্বৈরতন্ত্রবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইরান। এরই মধ্যে আন্দোলন দমনে গুলি চালিয়ে এক রাতে ২ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে। তাতে করে বিক্ষোভ আরও তেতে উঠেছে। রাজধানী তেহরানসহ ৩২ প্রদেশজুড়ে এ বিক্ষোভ উত্তাল রূপ নিয়েছে এবং প্রতিদিনই এর মাত্রা বাড়ছে। সব মিলিয়ে এই প্রথম ইরানের খামেনি সরকার কঠিন চাপে পড়েছে। যদিও সরকার থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই বিক্ষোভের মূলে রয়েছে বিদেশি চক্র, বিশেষ করে বিক্ষোভকারীদের সব রকম সহায়তা দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, টাইমস অব ইসরায়েল, এএফপি। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ইরানে চলমান বিক্ষোভে শুধু রাজধানী তেহরানেই এক রাতে ২০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার দিনগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা বহু সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আক্রমণ থেকে মসজিদও বাদ যায়নি। বিক্ষোভকারীদের হাতে এ সময় ইসলামি বিপ্লবপূর্ববর্তী (ক্ষমতাচ্যুত শাহ আমলের) পতাকা শোভা পেয়েছে। এসব পতাকা তারা বিভিন্ন ভবনে উড়িয়ে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তারা চার দশকের শৃঙ্খল ভাঙতে চলেছে এবং ইরানের আকাশে স্বাধীনতার নতুন সূর্যোদয় ঘটাচ্ছে। তেহরানের এক চিকিৎসক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শুধু তেহরানের ছয়টি হাসপাতালে ২০৬ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগ গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। তবে হাসপাতাল থেকে এসব লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, উত্তর তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনের বাইরে বিক্ষোভকারীদের মেশিনগান থেকে ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। সেখানে অন্তত ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। নিহতদের বেশির ভাগ তরুণ বলে জানিয়েছেন এই চিকিৎসক। বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে ইরানি নারীদের ওপর পোশাক, চলাফেরা এবং চিন্তার ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তার মূলে রয়েছে স্বৈরাচারী মোল্লাতন্ত্র। তারা মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ফতোয়া দিয়ে কোনোদিন মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠরোধ করা যায়নি। মোল্লাতন্ত্রের অন্ধকার রাজত্ব ছিঁড়ে নারীরা আজ নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যবিধাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শোষকের ছবি পুড়িয়ে তারা জানান দিচ্ছে শাসনের দিন শেষ, এবার শুরু হবে মানুষের জয়গান। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় টানা দুই রাত তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা তেহরানের একটি মসজিদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আগুন দিয়েছে ও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবপূর্ববর্তী সময়ের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের মতো শুক্রবার রাতেও বিক্ষোভ মাসহাদ, তাবরিজ, উরুমিয়াহ, ইসফাহান, কারাজ এবং ইয়জদে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসি ফার্সির একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। তারা সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু কামনা করে, রাজতন্ত্রের (শাহ শাসন) পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। অন্যদিকে বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে ইরান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেশটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচণায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এখন সহিংস হয়ে উঠেছে।
শহরকেন্দ্র দখলের আহ্বান রেজা পাহলভির : যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইরানের অপসারিত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ইরানিদের আরও লক্ষ্যভিত্তিক বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ আহ্বান জানান। এই বার্তায় পাহলভি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন আর শুধু রাস্তায় নামা নয়, লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখল ও ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া।’ তিনি রবিবার (আজ) আরও কঠোর বিক্ষোভের ডাক দেন। সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের বিক্ষোভে ব্যাপক জনসমাগমের প্রশংসা করেন পাহলভি। একই সঙ্গে তিনি জানান, নিজেও ইরানে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং বিশ্বাস করেন খুব দ্রুতই দেশে ফিরতে পারবেন। উল্লেখ্য, রেজা পাহলভির বাবা মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি ১৯৮০ সালে মারা যান।
ইরানি বাহিনীর ‘রেড লাইন’ ঘোষণা : ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দেশটির বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে রেড লাইন ঘোষণা করেছে। গতকাল শনিবার পৃথক বিবৃতিতে এই রেড লাইন ঘোষণা করেছে আইআরজিসি ও সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত দুই রাত ধরে সন্ত্রাসীরা সামরিক ও আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখলের চেষ্টা করছে। বেশ কয়েকজন নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা-কর্মীকে হত্যা করেছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করছে। ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির নিরাপত্তার স্বার্থে আইআরজিসি রেড লাইন ঘোষণা করছে। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতির চেষ্টা করলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নতুন করে হুমকি ট্রাম্পের : এদিকে চলমান আন্দোলনের মুখে কঠিক চাপে পড়া খামেনি সরকারকে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের যদি ইরান সরকার হত্যা করতেই থাকে তাহলে দেশটিতে কঠোর হামলা শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান (সরকার) বড় বিপদে আছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে বিক্ষোভকারীরা অনেক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এমনটি সম্ভব হতে পারে যা কয়েক সপ্তাহ আগে কেউ চিন্তাও করেনি। আমরা খুবই সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’ ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘আমি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছি, যদি আগের মতো তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, আমরা এর সঙ্গে জড়িত হব। এর অর্থ এই নয় যে আমাদের সেনারা ইরানে যাবে। কিন্তু এর অর্থ হলো, তাদের সেখানে খুবই কঠোর কঠোর হামলা চালাব, যেখানে হামলা চালালে তারা সবচেয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হবে। তবে এমনটি হোক আমরা চাই না।’ ইরানের বিক্ষোভকে অসাধারণ উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘ইরানে যা হচ্ছে তা বেশ অসাধারণ। ইরান সরকার বেশ খারাপ করেছে। তারা তাদের নাগরিকদের সঙ্গে খুব খারাপ করেছে। এখন তারা সেটির জবাব পাচ্ছে।’
বিপ্লবপূর্ব অবস্থানে ফিরছে ইরান : বিক্ষোভকারীদের হাতে ইসলামি বিপ্লবপূর্ববর্তী পতাকা এবং সে অবস্থানে ফিরে যাওয়ার স্লোগান গুরুত্ব পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ইরান কি ফের ক্ষমতাচ্যুত শাহ আমলে ফিরছে? প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্বীকৃতি জানানোর পর নতুন এই জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের বর্তমান সরকারকে হটাতে তাদের ভিতরের একটি অংশের সঙ্গে সমঝোতা করে থাকতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান সরকারকে হটাতে পারলে তাদেরই একটি অংশকে তিনি ক্ষমতায় রাখবেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইরানে শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে ট্রাম্পের এ অবস্থানকে অনেকে ভেনেজুয়েলায় তাঁর গৃহীত কৌশলের সঙ্গে তুলনা করছেন।
প্রসঙ্গত গত বৃহস্পতিবার পডকাস্ট সঞ্চালক হিউ হিউইট যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ৬৫ বছর বয়সি রেজা পাহলভির সঙ্গে দেখা করবেন কি না, তখন ট্রাম্প বিষয়টি এড়িয়ে যান। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁকে (পাহলভি) দেখেছি, তাঁকে একজন ভালো মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু এ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা ঠিক হবে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।’ ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের সবাইকে সুযোগ দেওয়া উচিত। দেখা যাক কে সামনে আসে। আমি নিশ্চিত নই, এই মুহূর্তে (সাক্ষাৎ করা) উপযুক্ত কাজ হবে কি না।’
এদিকে স্টিমসন সেন্টারের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক রান্ডা স্লিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে একটি বার্তা পাঠাচ্ছেন। বার্তাটি হলো, ভেনেজুয়েলার দিকে তাকান। খামেনিকে সরিয়ে দিন, আমি চুক্তির জন্য প্রস্তুত।’