প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ প্রয়াত নির্মল সেন ১৯৭৩ সালের ১৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় একটি কলাম লিখেছিলেন ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শিরোনামে। এ কলামটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, তা রীতিমতো একটি স্লোগানে পরিণত হয়েছিল।
যখন তিনি এ লেখাটি লিখেছিলেন তখন দেশজুড়ে ভয়াবহ বিশৃঙ্খল এক অবস্থা বিরাজ করছিল। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তখন বেশ নাজুক। চারদিকে ডাকাতি ছিনতাই হত্যা খুন গুমসহ নানা অরাজকতা চলছিল। এরকম একটা সময়ে তাঁর এই শিরোনামের কলামটি ছিল সারা দেশের মানুষের হৃদয়ের কথা। আজ ৫৩ বছর পর শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক নির্মল সেনের কলামের শিরোনামটি যেন বাংলাদেশের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য। এ শিরোনামের বাস্তবতা যেন আবারও অনুভব করছি আমরা।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করেছে। শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয় প্রকাশ্যে গুলি করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। প্রায় এক মাস পর এ হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদসহ পাঁচজন আসামি পলাতক।
হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের পরদিন ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে গ্রিন রোড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মুছাব্বির। সেখান থেকে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জানা যায়, রাত ৮টার কিছু পরে রাজধানীর তেজতুরি বাজার এলাকায় অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারীরা তাদের গুলি করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ফজলুল করিম বলেন, ‘স্টার কাবাবের পাশের ওই গলিতে দুজনকে গুলি করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৭৮৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন ১১টির মতো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানের একজন যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারে একজন প্রার্থীকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও সামনে আসছে। তফসিল ঘোষণার পর এক মাসের মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার ভবনে হামলাসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঢাকার কারওয়ান বাজারে সেখানকার ব্যবসায়ীরা একটি মানববন্ধনের আয়োজন করে। সেই মানববন্ধনে একজন যুবদল নেতার নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
ওই সময়কার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পুলিশের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটলেও অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিল পুলিশ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনাও হয়।
এমন পরিস্থিতিতে তফসিল ঘোষণার পর কয়েক দফায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নানা বৈঠকও করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন হয়েছে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
ঢাকাসহ সারা দেশে যেন কথায় কথায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। দিনাজপুর সদর উপজেলায় খয়রাত আলী (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ব্যাটারিচালিত ভ্যান ছিনতাই করে পালায় দুর্বৃত্তরা। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার ফতেপুর করালি নওশারার চরে গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে গুলি করে সোহেল রানা (৩৫) নামে এক যুবককে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় আলমগীর হোসেন (৫৫) নামে বিএনপির এক নেতাকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর খুলনায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে ডুমুরিয়া উপজেলার শলুয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন (৪৫) নিহত হন। গত ১৭ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে (৪৭) গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে (৫৫) ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এ তালিকা ক্রমশ বাড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জনগণের শঙ্কা, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা। এরকম একটা পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন অসহায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সরকারের কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে।
বর্তমান আইনশৃঙ্খলার অবনতি কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনীতি ও সামাজিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। একদিকে অপরাধীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিত্যনতুন অপরাধ সংঘটিত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও কলেজে যাওয়ার পথে শঙ্কিত, ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর সাধারণ নাগরিকরা নিজ নিজ বাসাবাড়িতেও নিরাপদ বোধ করছেন না। অপরাধীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তারা দিনদুপুরে প্রকাশ্যে খুনসহ নানা অপরাধ ঘটাতেও দ্বিধা করছে না। এ অবস্থায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তবে জনসাধারণের মধ্যে সরকার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি চরম হুমকির মুখে পড়বে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে পড়বে। এটি কেবল সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা যদি অপরাধীদের হাতে বিঘ্নিত হয়, তবে তা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচনি প্রচারণার সময় যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে হবে না। ভোটাররা ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। মনে রাখতে হবে, কম ভোটারের উপস্থিতি এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এরকম একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।
দেশে এখন যে অবস্থা চলছে, তাতে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তাই হলো মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া। নির্মল সেনের সেই সাড়াজাগানো শিরোনামই যেন আজ বাংলাদেশের মানুষের মনের কথা।