সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একজনকে টেনেহিঁচড়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন। পরে জানা যায় যাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ ওরফে রোমান শুভ। যারা নিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অন্যরা।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের আইন অনুষদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিজ বিভাগের সামনেই হেনস্তার শিকার হন ওই বিভাগের শিক্ষক। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে তিনি ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আওয়ামী ও বামপন্থি শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংগঠন হলুদ দলের একাংশের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রক্টর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাঁর ক্যাম্পাসে উপস্থিতির খবর পেয়ে চাকসুর প্রতিনিধিরা আইন অনুষদে যান। এদিকে চাকসু নেতাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই শিক্ষক অনুষদের পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এসব শিক্ষার্থী দৌড়ে তাঁকে আটক করেন। এ সময় ওই শিক্ষকের মুঠোফোনেও তল্লাশি চালানো হয়।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সমাজমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একজনকে পেছন থেকে তাঁকে চেপে ধরতে দেখা যায়। সেখানে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ চাকসু নেতারা জানান, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যায় সমর্থন, ছাত্রলীগের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হুমকি প্রদান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দিয়ে হয়রানি এবং সহকারী প্রক্টর থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মদত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৪তম সিন্ডিকেট সভায় ওই শিক্ষকের বেতন সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম রনি বলেন, ওই শিক্ষক যা করেছেন, সেগুলো ফৌজদারি অপরাধের আওতাভুক্ত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
চাকসুর আইনবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তাওহীদ বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত গণহত্যার সঙ্গে রোমান শুভর সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলে সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ‘জঙ্গি আখ্যা দিয়ে মামলা করেন। শুধু গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে আইন অনুষদের শিক্ষার্থী জুবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা করে তার শিক্ষা জীবন তছনছ করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর গত ২০ আগস্ট শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে সাত দফা অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ প্রসঙ্গে হাসান মুহাম্মদ রোমান শুভ বলেন, আমি একজন আইনের শিক্ষক। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও অংশ নিইনি। আমি কোনো মৌন মিছিলে অংশ নিইনি। কেউ তা প্রমাণ করতে পারলে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষককে বর্তমানে প্রক্টর অফিসে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যায় সম্পৃক্ততাসহ তিনটি অভিযোগ তদন্তাধীন। তবে তিনি যদি আগেই নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ প্রশাসনকে জানাতেন, তাহলে তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পরিস্থিতি এড়ানো যেত।