বিক্ষোভে উত্তাল ইরানে যেকোনো সময় মার্কিন হামলা শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ইরান বলেছে, হামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি উড়িয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থগিত ঘোষণা করেছে এবং কাতারের ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা ২৬ বছর বয়সি তরুণ ইরফান সোলতানিকে ফাঁসি দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে। গতকালই যেকোনো সময় এই তরুণের ফাঁসি হওয়ার কথা। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আর কিছু জানা যায়নি।
ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ইরফান সোলতানিকে ফাঁসি দেওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। ফাঁসির আগে গতকাল তাকে শেষবারের মতো ১০ মিনিটের জন্য পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়। এ তরুণের বিষয়ে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হেনগাও জানায়, তেহরানের বিপরীত পাশে ফারদিস এলাকার বাসিন্দা ইরফান সোলতানিকে ছয় দিন আগে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্রুততার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে বুধবারই তাকে ফাঁসি দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ইরফান স্থানীয় একটি পোশাকের দোকানের মালিক। তার বোন একজন আইনজীবী হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ইরানি কর্তৃপক্ষ তাকে ভাইয়ের মামলার নথিপত্র দেখার সুযোগ দেয়নি।
এর আগে মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে। তিনি বলেন, ‘যদি তারা ফাঁসি দেয়, তাহলে আপনারা সঙ্গে সঙ্গে কিছু ঘটতে দেখবেন।
রয়টার্স ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের পক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের হুমকির পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ওয়াশিংটন হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ‘তেহরান সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও তুরস্কসহ এ অঞ্চলের মার্কিন মিত্রদেশগুলোকে অনুরোধ করেছে, যেন তারা ওয়াশিংটনকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে এসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা হবে। এই বার্তা আমরা পরিষ্কারভাবে দিয়েছি।’ তিনি জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ ঘটনা ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ উত্তেজনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি উল্লেখযোগ্য, যা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর। এদিকে ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ইরানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদকে বলেছেন, পরিস্থিতি বর্তমানে ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে এবং ইরান যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আলজাজিরার আরেক খবরে বলা হয়, ইরানের চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদ থেকে কিছু মার্কিন সামরিক সদস্যকে ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যার মধ্যে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আল উদেইদে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। তবে এ বিষয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি : ইরানে চলমার বিক্ষোভে হতাহতের সংখ্যা প্রকৃত অর্থে কত- তা নিয়ে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেটসহ অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ থাকায় কেউই সঠিক নিহত বা আহতের সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না। ফলে একেক সময় একেক রকম তথ্য মিলছে। সর্বশেষ এক হিসাবে গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাক জানান, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৪০ জন নিহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন ১০ হাজার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তারা ২ হাজার ৪০৩ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪৭ জন সরকারপন্থির মৃত্যুর তথ্য যাচাই করতে পেরেছে।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ গতকাল আপডেট তথ্যে জানিয়েছে, ইরানে দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে প্রায় ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এ সংখ্যা ২০ হাজারও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বহির্বিশ্বে যে হতাহতের সংখ্যা শোনা যাচ্ছিল, সে তুলনায় প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। সূত্রটি জানিয়েছে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন, হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সূত্রের মাধ্যমে নিহতের সংখ্যা খুঁজে বের করছে। এসবের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হচ্ছে, বিক্ষোভে অন্তত ১২ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। এদিকে লন্ডন থেকে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারাও ১২ হাজার বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের একটি সূত্র তার ইরানের সূত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছে, গত কয়েক দিনের বিক্ষোভে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা এরই মধ্যে কয়েকটি ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেছে। এর মধ্যে একটিতে দেখা গেছে, তেহরানের উপকণ্ঠের একটি হাসপাতালের মর্গে প্রায় ৪০০ লাশ রয়েছে। চিকিৎসকরা লাশের ক্ষত নিরূপণ করছেন। এ সময় অনেককে প্রিয়জনের মৃতদেহ খুুঁজতে দেখা যায়। এ ছাড়া অন্যান্য হাসপাতালেও মৃতদেহে ঠাসা ছিল।