ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে বিদেশিরা। সরাসরি ঢাকায় আসছেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। তৎপর ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোও। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি চলমান পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন তারা। তবে পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। নির্বাচনে আইনি কাঠামোর প্রতিফলনের দিকেই বিশেষ নজর থাকবে তাদের।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে গত সপ্তাহে ঢাকায় এসেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবস। ঢাকায় নেমেই তিনি নির্বাচন কমিশন, প্রধান উপদেষ্টাসহ রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক সেরেছেন। গতকাল ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষণ মিশন চালু করেছে ইইউ। আগামী ১৭ জানুয়ারি থেকে দেশের ৬৪ জেলায় নির্বাচনি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ শুরু করবে ইউরোপীয় মিশনের সদস্যরা। এদিকে গতকাল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিস ও মর্স ট্যান।
এর আগে, ইভার্স ইজাবস ঢাকায় নেমেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়াও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে নির্বাচনের পরিবেশ, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার দিকে নজর থাকবে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের। বিশেষ করে- জাতীয় আইন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিনা সেটি মূল্যায়ন করাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি আইনি কাঠামো, নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থা, নির্বাচনি পরিবেশ এবং প্রার্থীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবে তারা। এ ছাড়াও ভোটার তালিকার প্রতি আস্থা, নির্বাচনি বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের পরিসর এবং পুরো প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র মূল্যায়ন করা হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনসংক্রান্ত আলোচনার দিকেও থাকবে বাড়তি নজরদারি।
এদিকে নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক ও ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য বিদায়ি চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। এসব বৈঠকে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা। নির্বাচন ঘিরে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহায়তা চান প্রধান উপদেষ্টা।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার সুসান রাইল, জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল।
এ ছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। একইদিন বিএনপির এই নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার আইয়াজ সাদিক, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুংগেলসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সাক্ষাৎ করেন জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ, চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্টেট সেক্রেটারি মি. অ্যালবার্ট টি. গম্বিসের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল এবং ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক পাওলা পাম্পালোনির নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বিদেশি কূটনীতিকরা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি নির্বাচন পরবর্তী সময়ের পরিকল্পনা ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন।
বিদেশি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটারদের আস্থা ও বিশ্বাস আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে মিথ্যা সংবাদ, গুজব ও অনুমানের ছড়াছড়ি চলছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
এ ছাড়া নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় ভারসাম্য রক্ষাও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।