রাজধানীর উত্তরায় ১১ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবারের ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) ও তাদের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২) এবং মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) ও হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। গতকাল সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ৩৫ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিস ধারণা করছে, রান্নাঘরের গ্যাস লিকেজ অথবা ডাইনিং রুমে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এ ঘটনায় ধোঁয়ায় অসুস্থ অন্তত ১০ জনকে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে ভবনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মৃতরা ভবনটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় পৃথক দুটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুন লেগে তা ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়লে অগ্নিকাণ্ডের সময় ছাদ তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকায় তারা সিঁড়িতে আটকা পড়েন। একদিকে তালাবদ্ধ গেট আরেকদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। এমন অবস্থায় আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে মৃত্যুর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেন তারা। চিকিৎসকরাও জানিয়েছেন, মৃতদের শরীরে কোনো পোড়া ক্ষতের চিহ্ন নেই। ধোঁয়ায় লাশগুলো কালো হয়ে গেছে। শ্বাস বন্ধ হয়েই তাদের ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, ছয় তলাবিশিষ্ট ভবনের সামনে উৎসুক জনতার ভিড়। ভবনের ভিতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ভবনের ভিতর থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ভবনের ডান পাশের ইউনিটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাজুড়ে আগুনের পোড়া ক্ষত। তৃতীয় তলার এসির বিস্ফোরণ ঘটে অঙ্গার হয়ে গেছে। গলে পড়েছে জানালার থাই গ্লাস। অন্য ফ্ল্যাটের থাই গ্লাসও ভাঙা। কালো দাগ দেখে বাইরে থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আগুনের ধোঁয়ার নির্গত মুখ ছিল সিঁড়ি। আশপাশের ভবনগুলোতেও সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তবে সেগুলোতে আগুন ছড়ায়নি। ভবনটির কেয়ারটেকার বিপ্লব হোসেন বলেন, ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ডান পাশের ইউনিট, বাড়িওয়ালা জুয়েল মোল্লার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট। এই ডুপ্লেক্সের নিচতলা অর্থাৎ ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর আমরা কয়েকটি শব্দ শুনতে পাই। বাড়িওয়ালার পরিবারের লোকজন নিচে এসে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন তৃতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নির্বাপণের কাজ শুরু করে। পাশের বাড়ির কেয়ারটেকার মো. মিজান বলেন, একটি বিকট শব্দ পেয়ে ভবন থেকে বেরিয়ে এসে আমরা আগুন দেখতে পাই। কীভাবে আগুন লেগেছে তা আমরা জানি না। তবে দাউদাউ করে আগুন জ্বলার সময় আটকে পড়া মানুষেরা চিৎকার করতে থাকেন। একপর্যায়ে চিৎকারের শব্দ কমে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস বেশ কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, বাড়ির মালিকের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের নিচ তলায় ছিল ডাইনিং, ড্রয়িং ও রান্নাঘর। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে বাসাটি ডেকোরেশন করা ছিল। এভাবে ডেকোরেশনে যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খুবই দাহ্য হয়ে থাকে। ফলে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আগুনের টানেল ছিল সিঁড়ি। এ কারণে ওপরে আটকে পড়া বাসিন্দারা নিচে নামতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় তলায় দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। আমরা ধারণা করছি, গ্যাস লিকেজ অথবা শর্টসার্কিটে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
তালাবদ্ধ ছাদ ডেকে আনে মৃত্যু : মৃতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, মৃত কাজী ফজলে রাব্বি রিজভীর বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ে। তার বাবার নাম কাজী খোরশেদুল আলম। রাব্বি পরিবার নিয়ে ভবনের পঞ্চম তলায় থাকতেন এবং এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী মৃত সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। তাদের আরেক ছেলে ফাইয়াজ উত্তরায় নানির বাসায় থাকায় বিপদ থেকে বেঁচে গেছে। সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাব্বির মৃতদেহ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং রিশানের মৃতদেহ ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে রয়েছে বলে জানায় পুলিশ। পরিবার নিয়ে ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকতেন মো. হারিছ উদ্দিন। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। হারিছ ও তার ছেলে রাহাবকে মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলাকে লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ফল ব্যবসায়ী হারিছ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি জটিলতার কারণে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো। ভবনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ছাদ তালাবদ্ধ না থাকলে প্রাণে বেঁচে যেতে পারতেন এই ছয়জনই। নিহত সুবর্ণার মামাতো ভাই মো. আবু সাইদ জানান, রাব্বি ও সুবর্ণা দম্পতি দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় তাদের দুই ছেলেই উত্তরায় নানির বাসায় থাকত। শুক্রবার অফিস বন্ধের দিন হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার রাতেই ছোট ছেলেকে নানির বাসা থেকে মায়ের বাসায় নিয়ে আসে। এরপর আজ (গতকাল) সকালে ওই বাসায় আগুনের সংবাদ পান স্বজনরা।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা প্রদানে স্থানীয় শাখা সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানান।
অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এই শোক প্রকাশ এবং নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।