সংবাদকর্মীদের সংঘবদ্ধতা ও সম্মিলিত প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠল গণমাধ্যম সম্মিলনে। ঐক্যের ডাক দিলেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা। সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকরা মনে করছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা দেশের কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ঐক্য প্রয়োজন। মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক- সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তাহলে সংবাদপত্রের ভূমিকা, সাংবাদিকের উন্নয়ন এবং সংবাদপত্রের উন্নয়ন সম্ভব হবে।
গতকাল সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গণমাধ্যম সম্মিলনে এসব কথা বলেন দেশের সিনিয়র সাংবাদিকরা। সম্পাদক, সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন, মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা অংশ নেন এ সম্মিলনে। সকালে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে গণমাধ্যম সম্মিলন শুরু হয়। সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এ সম্মিলনের আয়োজন করে। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, সংবাদপত্র ও অপরাপর গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো কেবলমাত্র ২০০, ৫০০ বা ৫-১০ হাজার সাংবাদিকের মনের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করারই একমাত্র হাতিয়ার নয়। এগুলো যদি সচল ও সক্রিয় না থাকে, এগুলো যদি উচ্চকণ্ঠ হতে না পারে, তবে গোটা সমাজের মধ্যেই নানা ধরনের অধিকার ব্যাহত হতে বাধ্য। তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা সর্বব্যাপী। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা কোনো অপরাধের আকাক্সক্ষা হতে পারে না। এই গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে সেগুলোকে রাষ্ট্র, সরকার, আইনগতভাবে কিংবা পেশিশক্তির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর জন্য নিজেদের মধ্যে একদিকে যেমন এই সংঘবদ্ধতার প্রয়োজন, তেমনি সম্মিলিত প্রয়াসগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, সরকারকে একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সত্য কথা বলে, আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থা নয়। একটি সরকার যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে এবং উদারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, তবে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কারণ যে সমাজে সাংবাদিকতা শক্তিশালী ও স্বাধীন, সেই সমাজ তত বেশি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন হয়। তিনি আদালত অবমাননা বা কনটেম্পট অব কোর্ট আইনের অপব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমরা বিচার বিভাগকে হেয় করার জন্য লেখি না। তাদেরও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে চাই। বিচার বিভাগ যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক শক্তি হয়। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকার এলেই সাংবাদিকরা সব পেয়ে যাবেন, এমন ভাবার কারণ নেই। অতীতে হয়নি, এখনো হবে না। আগামীর ভাবনাটাও আমাদের জন্য সাবধানের, সতর্কতার সঙ্গে ভাবতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ঐক্য, সমঝোতা এবং সংহতি- এই সময়ে আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমাদের মানতে হবে। যে মতের, যে চিন্তা, যে ভাবনা, যে আদর্শের হোক না কেন সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি সব বিষয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একজনকে আরেকজনের পাশে দাঁড়াতে হবে।
যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, আমাদের যখন দালাল বলা হয়, দুঃখ লাগে এবং বলবেই না কেন? যারা ছিল কদিন আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে তারা সবাই হয়ে গেল এখন বিএনপির পক্ষে, এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার নাকি এটা ম্যাজিক। এই ম্যাজিকের পাল্লায় পড়বেন না। এতে সম্মান বাড়ছে না বরং কমছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে সম্মানজনক পেশা হয়ে ওঠেনি। সাংবাদিকরা বর্তমানে যে অবস্থানে আছেন, তা সম্মানজনক নয়। অথচ সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। শফিক রেহমান আরও বলেন, সাংবাদিকদের প্রতি আমার একটি পরামর্শ, আপনারা একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখুন।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, আমি শুধু এইটুকুই আশা করি, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তরণে আমরা যাব, যারা এই জনগণের ম্যান্ডেট পাবে, তারা যেন আমাদের এই কথাগুলো শুনে, তাহলে হয়তোবা আগামী দিনে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য তারা একটা পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারবে। রংপুরের দৈনিক যুগের আলোর সম্পাদক এবং প্রকাশক মমতাজ শিরীন বলেন, গণমাধ্যমকে রক্ষা করতে হলে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। গণমাধ্যমকে রাজনীতির বাইরে রাখলেই আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারব।
নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহসভাপতি মুনিমা সুলতানা বলেন, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থেকে বের হয়ে আসা দরকার। চট্টগ্রামভিত্তিক দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে তথ্যের শূন্যস্থান তৈরি হয়। আর এই শূন্যস্থান দখল করে নেয় ফেক নিউজ বা ভুয়া সংবাদ, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় না বা তারা পান না। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মানটা রক্ষা করা যাচ্ছে না। এটা রক্ষা করতে না পারার কারণগুলো দূর করতে হবে। সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য আমরা একটা সাংবাদিকতা সুরক্ষা আইনের সুপারিশ করেছিলাম সংস্কার কমিশন থেকে এবং এই সুরক্ষা আইনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন সবাই। আইন হওয়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে দুজন উপদেষ্টা ছিলেন তারা অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু সে আইনটা হয়নি। আমি বলব, আমরা সুপারিশ জমা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যতজন গণমাধ্যমকর্মী দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত হয়েছেন, যেসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আক্রমণের শিকার হয়েছে, এর দায়দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। কারণ তারা অঙ্গীকার করেও তা বাস্তবায়ন করেনি। যশোর থেকে আসা সাংবাদিক একরাম উদ দৌলা বলেন, একটি ঐক্যের সুবাতাস দেখা যাচ্ছে। ভয়, বাধাহীনভাবে কাজ করতে চাইলে ঐক্যের বিকল্প নেই। গাজীপুরের শ্রীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি এস এম মাহফুল হাসান হান্নান বলেন, সত্যিই ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। অধিকার কেউ কাউকে বিলিয়ে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়।
লক্ষ্মীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান বলেন, সব বিজ্ঞ সাংবাদিক, বিজ্ঞ নেতার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আমাদের ঐক্য প্রয়োজন। মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে আমাদের যে উপলব্ধি হয়েছে, আমি মনে করি ঐক্য দরকার। কিন্তু ঐক্যের কথা বলেও আসলে কি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারব?