আনিস (ছদ্মনাম), একজন ব্যবসায়ী। গত সপ্তাহে তিনি তার অফিসে যাননি। এক সপ্তাহ ধরে তিনি তার সেলফোনটিও বন্ধ রেখেছেন। অফিসের লোকজন জরুরি প্রয়োজনে তার সঙ্গে দেখা করেন গোপনে। না, কোনো পাওনাদারের ভয়ে নয়। তার বিরুদ্ধে নেই কোনো মামলাও। তবুও কেন তার এই আত্মগোপন? অফিসে তার সহকর্মীরা জানালেন, চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই বাধ্য হয়ে তিনি এমন পন্থা অবলম্বন করেছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই তার অফিসে চাঁদাবাজি করতে আসতে থাকেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে লোকজন। নির্বাচনের জন্য টাকা লাগবে, এমন চাপ বাড়তেই থাকে, প্রতিদিন। অসহায় এই ব্যবসায়ী কাকে চাঁদা দেবেন, কতজনকে দেবেন? অগত্যা এই আত্মগোপন।
শুধু আনিস একা নন, বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ী থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সবারই এখন একই অবস্থা। চাঁদাবাজির অত্যাচার থেকে বাঁচতে বেশির ভাগ বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এখন একরকম পলাতক জীবনযাপন করছেন। অফিসে যাচ্ছেন না ঠিকমতো, নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রাখছেন। নীরব চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। এমনিতেই গত দেড় বছর অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। মব সন্ত্রাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মামলা-হামলায় অস্থির বেসরকারি খাত। নতুন বিনিয়োগের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিল্প মালিকরা। অনেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন। এর মধ্যে নির্বাচনি চাঁদাবাজি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। নীরব চাঁদাবাজির মহামারি শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই। আওয়ামী লীগের পতনের পর একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী মাঠে নামেন। নানা ধরনের পরিচয়ে তারা দেশজুড়ে শুরু করেন চাঁদাবাজি আর লুটপাট। এই ধারা এখনো অব্যাহত। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের ধাক্কায় কেবল চেহারায় বদল ঘটেছে, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। সরকার বদলের শুরুর দিকে কিছুটা ‘বিরতি’র পর চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেলফেরত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। দলেবলে মাঠে নেমে পড়েছে চাঁদাবাজরা। ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, ফুটপাত, বাজার, ঝুট ব্যবসা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্মাণকাজ থেকে চাঁদাবাজি ও আর্থিক সুবিধা আদায়ের ঘটনা ঘটছে দেশের সর্বত্র। চাঁদাবাজদের সবচেয়ে বড় টার্গেট পয়েন্ট হচ্ছে শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা, বাস, নৌ টার্মিনাল ও হাটবাজার। এই চাঁদাবাজদের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের অনুগত হয়ে আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যবসায়ী আর বাসিন্দারা অতিষ্ঠ ছিলেন এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের অত্যাচারে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সেই সরকারের পতনের পর নির্যাতিতরা ভেবেছিলেন তাদের ভাগ্যে বোধ হয় পরিবর্তন আসবে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা ঘটেনি। বিগত সরকারের আমলের চাঁদাবাজদের ছেড়ে যাওয়া শূন্য আসন পূর্ণ হয়ে গেছে খুব দ্রুতই। সব পয়েন্টেই আবার নতুন করে শুরু হয়েছে দখল ও চাঁদাবাজি। আর এই চাঁদাবাজরাও বর্তমান সময়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অসাধু নেতার আশীর্বাদপুষ্ট। তবে পুলিশের চাঁদাবাজি নিয়ে আপাতত তেমন অভিযোগ মিলছে না। এখন শুরু হয়েছে বিভিন্ন দলের প্রার্থীর নামে চাঁদাবাজি। এতে আতঙ্কে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদার জন্য গুলি, হামলা ও হত্যায় উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে অগ্রগতি না থাকায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীরা।
চট্টগ্রামের চান্দনপুরা এলাকা। গভীর রাতে মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের গুলিতে কেঁপে ওঠে সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসভবন। গত ২ জানুয়ারি ভোরের আলোয় কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নামে বিদেশি নম্বর থেকে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দেওয়ায় ভয় দেখাতেই এ হামলা।
কয়েক দিন আগেও চট্টগ্রামের হামজারবাগে একটি নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদা না পেয়ে গুলি ও তিন শ্রমিককে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। একই থানায় দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লুট হয় প্রায় ৩৫০ ভরি স্বর্ণ। সর্বশেষ বিএডিসি কার্যালয়ে ঢুকে টেন্ডার বাগিয়ে নিতে কর্মচারীদের হত্যার হুমকির অভিযোগ উঠেছে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচন ঘিরে খাতভিত্তিক প্রকাশ্য ও নীরব চাঁদাবাজি বেড়েছে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে ভয় পায়। সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে আক্রান্ত হন। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধনে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। ওই এলাকায় কয়েক মাস ধরে নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হওয়ায় তারা প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হয়েছিলেন। মানববন্ধন শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা পর হামলাকারীরা হঠাৎ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও ছিল দর্শকের। এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, চাঁদাবাজদের কাছে মানুষ কতটা অসহায়. কতটা বিপন্ন।
দেশে এখন চাঁদাবাজি চলছে সবখানেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে হাটবাজার, শপিং মল থেকে মুদির দোকান, খেয়াঘাট থেকে পাবলিক টয়লেট, চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য কোথায় নেই। চাঁদাবাজরা এখন সরকারের চেয়েও ক্ষমতাবান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পায়। দেশে এখন কে ক্ষমতাবান তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন আর কার বিরুদ্ধে নেবেন না- সেটা এখন গোলকধাঁধা। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের চাকরি নিয়ে টানাটানি হয় কি না, এমন আতঙ্কে থাকেন অনেকেই। তাই চাঁদাবাজরা এখন বুক ফুলিয়ে চলে। কেউ কেউ নিজেদের জুলাই যোদ্ধা দাবি করে। বাস্তবে তারা আসলে যে কী তা যাচাই করার সাহস নেই কারও। জুলাই বিপ্লব কি অবাধে চাঁদাবাজির লাইসেন্স দেয়? এসব চাঁদাবাজির কারণে অনেকের কাছেই আজ জুলাই আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কেউ সাহস করে এসব মতলববাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় না।
চাঁদাবাজরা কোনো দলের হতে পারে না, চাঁদাবাজরা দেশের শত্রু, জনগণের শক্র- এই কথাটা সাহস করে বলে, সরকার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে চাঁদাবাজরা গত দেড় বছরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তারা চাঁদাবাজি করেছে ভয়হীনভাবে। চাঁদাবাজ, অবৈধ অস্ত্রধারী, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে নির্বাচনি আমেজ চাঁদাবাজদের জন্য নিয়ে এসেছে আকর্ষণীয় সুযোগ। এই নির্বাচনি মৌসুম চাঁদাবাজদের করেছে আরও বেপরোয়া। যে যেভাবে পারছে শুরু করেছে চাঁদাবাজি। কয়েকজন একত্রিত হয়ে, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। কোনো প্রার্থী অথবা দলের নামে নির্বাচনি তহবিলের জন্য অর্থ দাবি করছে, না দিলে প্রথমে হুমকি, তারপর মিথ্যা মামলা। আর মামলার পরই শুরু হয় মব সন্ত্রাস। অর্থাৎ হয় আপনি তাদের চাঁদা দেবেন না হলে আপনি প্রবেশ করবেন হয়রানি আর দুর্ভোগের অন্ধকার টানেলে। এরকম একটি ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে আজ দেশে। অবিলম্বে এই অরাজকতা বন্ধ করতে হবে। চাঁদাবাজদের সর্বগ্রাসী তৎপরতা বন্ধ করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কঠোর হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বলতে হবে, তারা কোনো চাঁদাবাজকে আশ্রয় দেবে না। এই নির্বাচনে সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে চাঁদাবাজদের বয়কট করতে হবে। না বলতে হবে চাঁদাবাজকে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বিলীন হয়ে যাবে। নির্বাচনে যারাই জয়ী হোক, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে তারা জনগণের কল্যাণ করতে পারবে না। আমরা কি পারব চাঁদাবাজি মুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে? নাকি এই দুর্বৃত্তদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকব?