আদর্শ ভিন্ন হলেও দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা সবার মধ্যে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। গতকাল রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘জাতি গঠনে নারী : নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে দেওয়া এ বক্তব্যে জাইমা রহমান নারীর ভূমিকা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। জাইমা রহমান বলেন, আজ আমরা এখানে যারা উপস্থিত সবাই একরকম নই। আমাদের আদর্শ, অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। তার পরও আমরা একসঙ্গে বসেছি, আলোচনা করছি। কারণ আমরা সবাই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভাবছি। আর এ ভিন্নতা নিয়েই একসঙ্গে কথা বলছি, একে অপরের কথা শুনছি। এটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।
সাংবাদিক কাজী জেসিনের পরিচালনায় সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা তামারা আবেদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
জাইমা রহমান বলেন, ভিন্ন এক অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে এখানে দাঁড়িয়েছি। বাংলাদেশের এই পলিসি লেভেলে আমার প্রথম বক্তব্য এটা। আমি এমন কেউ নই যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে বা সব সমস্যার সমাধান জানা আছে। তবু আমি বিশ্বাস করি নিজের ছোট্ট জায়গা থেকেও সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবার মধ্যে থাকা উচিত। আজ আমি এসেছি শুধু শুনতে, শিখতে এবং একসঙ্গে কাজ করার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে।
বাংলাদেশের উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে জাইমা রহমান বলেন, নারী সমতা কেবল নারীদের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি সামগ্রিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় ইস্যু। অর্ধেক জনসংখ্যাকে গৃহস্থালির অদৃশ্য শ্রম আর সামাজিক চাপে কোণঠাসা করে রেখে কোনো দেশের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনিই প্রথম নারী ও কন্যাশিশুদের উন্নয়নের জন্য মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছিলেন। এ ছাড়া পোশাক খাতের মাধ্যমে লাখ লাখ নারীকে তিনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছিলেন।
জাইমা রহমান তাঁর দাদি বেগম খালেদা জিয়ার শিক্ষা বিপ্লবের স্মৃতিচারণা করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ ও মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা কর্মসূচি বিদেশেও মডেল হিসেবে স্বীকৃত। লন্ডনের একটি হাসপাতালে দাদুকে চিকিৎসা দিতে আসা নাইজেরিয়ার একজন নার্সও বাংলাদেশে নারী শিক্ষার এ অগ্রগতির কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন।
বর্তমান বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, কেবল আইন বা নীতি দিয়ে সমতা আসবে না, যদি না আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশে নারীরা ৮৫ শতাংশ গৃহস্থালি কাজ বিনা পারিশ্রমিকে করেন, যার আর্থিক মূল্য জিডিপির ১৯ শতাংশ। অথচ শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো ৪০ শতাংশের নিচে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিয়ের পর বা সন্তান জন্মের পর নারীরা স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারণ সমাজ ধরে নেয় এ ত্যাগ কেবল নারীকেই করতে হবে।
অনলাইন হয়রানির বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগের উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী অনলাইনে হেনস্তার শিকার হন। বাবারা যদি মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলেন এবং ঘরে বৈষম্য দূর করেন, তবেই সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। এ সময় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুধু রাজনীতিতে নয়, দেশের অর্থনীতিতেও নারীদের অংশগ্রহণ চিন্তা করতে হবে, যাতে তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নারীদের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা ‘একসেস টু ফাইন্যান্স’। নারী উদ্যোক্তা বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতেও সমস্যা হয়। ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের এ বিষয়টিতে নজর দিতে হবে। নারীরাই অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতিচ্ছবি। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ বের হয়ে যাওয়ার পর নারীরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বলেও জানান তিনি।