চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে মাইকে ঘোষণা দিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ হামলায় অন্তত ৫০০ জন অংশ নেয়। সোমবার সন্ধ্যায় এ বর্বোরচিত হামলার পর ২৪ ঘণ্টা কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল বলেন, এরই মধ্যে এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে র্যাব। হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ওই ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ এসেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে। ওই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় র্যাবের দুটি মাইক্রোবাস সামনে-পেছনে করে সলিমপুরে প্রবেশ করছে। এ সময় র্যাবের উপস্থিতি বুঝতে পেয়ে কিছু লোক ছোটাছুটি শুরু করে। একই সময়ে কিছু ব্যক্তি লাঠিসোঁটা নিয়ে মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে দৌড়াতে যায়। একপর্যায়ে মাইক্রোবাস দুটির কাচ ভাঙচুর করে তারা। একপর্যায়ে ওই এলাকায় মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয় র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানোর জন্য। একই ঘোষণায় এলাকার ফটক আটকানোর জন্য বলছিলেন এক ব্যক্তি।
অবৈধ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি : জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী ও তাদের অবৈধ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গাস্থ র্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সুবেদার মোতালেব শহীদ হয়েছেন। এজন্য যারা দায়ী, আমরা তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসব। বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে যেন তাদের সাজা নিশ্চিত হয়। সেটি আমরা যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করব। আর জঙ্গল সলিমপুর, যা একটি সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
খুব শিগগিরই আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ ও অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হবে।
বাবার নিথর দেশের পাশে সন্তানদের কান্না : র্যাব কার্যালয়ের মাঠের পাশেই রাখা ছিল র্যাবের উপসহকারী পরিচালক ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার নিথর দেহ। তার অল্প দূরে মাঠে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল তাঁর ছোট মেয়ে ইসরাত জাহান। কান্নার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছিল একটি শব্দ ‘আব্বু’ ‘আব্বু’। আর অপলক দৃষ্টিকে লাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মোতালেবের স্ত্রী শামসুন্নাহার, বড় ছেলে মেহেদী হাসান, বড় মেয়ে শামিমা জান্নাতসহ কয়েকজন আত্মীয়। জানাজা শেষে তাঁর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা সদরের অলিপুরের গ্রামের বাড়িতে।
শোকে কাঁদছে অলিপুর : নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার অলিপুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ভোর থেকেই আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ মোতালেব হোসেনের বাড়িতে ছুটে আসেন। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। নিহত মোতালেব হোসেন ছিলেন ১১ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই ভাইবোনদের আদর-স্নেহে বড় হলেও সাহসী মানুষ হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
নিহতের বড় ভাই মো. মুজিবুর রহমান ভূঁইয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দেশের জন্য আমার ভাই জীবন দিয়েছে। সে আমাদের গর্ব। কিন্তু যারা এ সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ছোট ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম। তিনি বলেন, শুক্রবার আমার ভাই বাড়িতে এসেছিল। চট্টগ্রামে যাওয়ার সময় তার বড় মেয়ে বারবার বলছিল ‘আব্বু আজ যেও না।’ মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে মোতালেব বলেছিল, সরকারি কাজ, যেতেই হবে। মেয়েটি কান্না বুকে জমা রেখেই বাবাকে বিদায় দেয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাত্র দুই দিন আগে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে যান মোতালেব হোসেন। যাওয়ার সময় বড় মেয়ে তাকে কর্মস্থলে যেতে বাধা দিয়েছিল বলেও পরিবার জানায়। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জনক।
এদিকে চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার লাশ গ্রামে পৌঁছালে নিজ বাড়ির সামনে মসজিদের পাশেই তাকে দাফন করা হবে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।