ক্ষমতায় গেলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ভাবনা ও নির্বাচনকালীন কৌশল বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেছে বিএনপি। গতকাল বিকালে রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে ‘পলিসি ডিসেমিনেশন অন প্রায়োরিটি সোশ্যাল পলিসিস’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে দলটি। এতে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আইআআই, ডিআই, ইরান, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশের ৩০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রাশেদুল হক প্রমুখ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘২০০৯ সালের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে এটিকে মাফিয়া অর্থনীতিতে পরিণত করেছিল। দেশকে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর জন্য স্বর্গে পরিণত করা হয়েছিল এবং ব্যাংকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে লুট করা হয়েছিল। ব্যাংকিং খাতের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরের তথাকথিত উন্নয়ন ছিল সম্পর্কহীন, জবাবদিহির অভাব ও দুর্নীতিতে ভরা। দেশকে নজিরবিহীন নির্বাচন কারচুপির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে ভোটাররা নির্বাচনব্যবস্থায় কার্যত অনুপস্থিত ছিল। এ পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়, যা নতুন আশা ও সুযোগের সৃষ্টি করে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকের দিনে চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, তবে বিএনপি ইতোমধ্যে এমন নীতিমালা প্রণয়নে কঠোর পরিশ্রম করেছে, যা বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে সুশীল ও টেকসই পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণার অধীনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নতুন যুগের সূচনা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও প্রবৃদ্ধিমুখী এবং সমাজ গড়ে উঠবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির ওপর, যেখানে সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে মানুষ।’ দলীয় প্রধানের প্রস্তাবিত কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দূরদর্শী নেতৃত্বে উন্নত ধারণা, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন সুযোগ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।’ মূল প্রবন্ধে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির আওতায় বিস্তারিত সামাজিক নীতিকাঠামো তুলে ধরেন। বিভাজনমূলক রাজনীতি থেকে ফলাফলভিত্তিক শাসনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে তিনি কথা বলেন এবং অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের মধ্যে নাগরিকদের দৈনন্দিন সংকট মোকাবিলায় আটটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের রূপরেখা দেন।
আটটি মূল সামাজিক নীতিমালা হলো-
ফ্যামিলি কার্ড : অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মাধ্যমে পরিবারকে মাসিক (২,০০০-২,৫০০ টাকা) সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, সঞ্চয়সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবারে সহনশীলতা গড়ে তোলা যায়।
কৃষক কার্ড : ভর্তুকিপ্রাপ্ত উপকরণ, সহজ ঋণ, বিমা ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কৃষকের জন্য একটি ডিজিটাল উপকরণ, যাতে জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে।
স্বাস্থ্য : প্রতিরোধমূলক সেবাভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর; প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট এবং রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চস্তরের হাসপাতালের সঙ্গে সংযোগ।
শিক্ষা : শুধু ভর্তি নয়, শেখার মান, প্রাসঙ্গিকতা ও আনন্দের ওপর গুরুত্ব; শিক্ষক উন্নয়ন, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, তৃতীয় ভাষা, মূলধারায় কারিগরি শিক্ষা এবং মেয়েদের সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা : যুবকেন্দ্রিক কৌশল, দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, আইটি, ব্লু ইকোনমি ও প্রবাসী কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে; উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা থাকবে।
ক্রীড়া : শারীরিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ, ক্যারিয়ার গঠনের পথ তৈরি এবং বিশেষ করে নারীদের অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়ে ক্রীড়াকে জাতিগঠনের নীতিতে রূপ দেওয়া।
পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা : খাল খনন, বাঁধসহ বৃহৎ পরিসরের পানি ব্যবস্থাপনা, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় সহনশীলতা বৃদ্ধি।
ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা ও কল্যাণ : সব ধর্মীয় নেতাদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্মানি প্রদান, যাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদার হয়।