ভারতের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে কি না, ক্রিকেটাররা এ বিষয়ে কখনোই সরাসরি কিছু বলেননি। নানানভাবে প্রশ্ন করার পরও উত্তর দেননি। হতাশ করেছেন বারবার। অনেক সময় বিরক্ত হয়ে জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। মিডিয়ার মুখোমুখিতে কিছু না বললেও টি-২০ বিশ্বকাপ খেলার জন্য মুখিয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। টানেলের শেষ প্রান্তে এক বিন্দু আলো দেখার মতো টি-২০ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় ছিলেন লিটন দাস, তাওহিদ হৃদয়, মুস্তাফিজুর রহমানরা। গতকাল তাদের অপেক্ষায় সমাপ্তি রেখা টেনে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম গতকাল ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে মিডিয়ার মুখোমুখিতে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, ভারতের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আগের অবস্থানেই অনড় বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ‘এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সরকারের।’
আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া হয় ৩ জানুয়ারি। ৪ জানুয়ারি বিসিবি থেকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় ভারতের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপে অংশ নেবে না এবং ভারত থেকে ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় সরালেই টি-২০ বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ। ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ার অনড় অবস্থানে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির সমাধানে বিসিবির সঙ্গে ক্রিকেটের শাসক সংস্থাটি যোগাযোগ চালিয়ে যেতে থাকে। গত শনিবার প্রতিনিধি এসে বৈঠক করেন। দুই পক্ষের সভায় আইসিসি প্রতিনিধি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, ভেন্যু পরিবর্তনেরর কোনো সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশকে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে হবে ভারতের মাটিতে। এরপর বুধবার আইসিসি জরুরি বোর্ড সভা ডাকে। সেই সভায় ১৫ সদস্যের ১৩ জনই বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট দেয়। বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র ভোট দেয় পাকিস্তান। বোর্ড সভা শেষে বিসিবি সভাপতি আইসিসি থেকে সময় চেয়ে নেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে। আইসিসি ২৪ ঘণ্টা সময় দেয়। সেই সময়সীমায় গতকাল ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক করেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং বিসিবি সভাপতি। এরপর মিডিয়ার মুখোমুখিতে ভারতের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্রিকেটের অনেক বড় একজন ভক্ত। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে লিটন আছে, মিরাজ আছে, নাজমুল আছে, সোহান, তামিম সবারই ভক্ত। স্বভাবতই আমরা সবাই চেয়েছি, আমরা যেন বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলতে পারি, আমরা যেন টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে পারি। কারণ আমাদের ক্রিকেটাররা এটা কষ্ট করে অর্জন করেছে। কিন্তু আমাদের যে নিরাপত্তা ঝুঁকি ভারতে খেলার ক্ষেত্রে, সেই নিরাপত্তা ঝুঁকি পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এটা কোনো বায়বীয় বিশ্লেষণ বা ধারণা থেকে হয়নি। এটা একটা সত্যিকারের ঘটনা থেকে হয়েছে। যেখানে আমাদের দেশের এক সেরা প্লেয়ারকে উগ্রবাদীদের কাছে মাথা নত করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাকে ভারত থেকে বের করে দিয়েছে; সোজা কথা, বের করে দিতে বলেছে।’
আইসিসি অফিশিয়ালি চিঠি দিয়ে বিসিবিকে জানিয়েছে, বাংলাদেশ যদি টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যায়, তাহলে বাংলাদেশের পরিবর্তে নতুন একটি দলকে অন্তর্ভুক্ত করবে। সে ক্ষেত্রে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা স্কটল্যান্ডের সম্ভাবনাই বেশি। আইসিসি হয়তো আজ-কালের মধ্যেই বাংলাদেশের পরিবর্তে নতুন দেশের কথা জানাবে। টি-২০ বিশ্বকাপের সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ ‘সি’ গ্রুপে খেলার কথা। গ্রুপের বাকি চার দল-ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, ইতালি ও নেপাল।
বিসিবি ও আইসিসি বেশ কয়েকবার চিঠি চালাচালি করেছে নিরাপত্তা ও ভেন্যুসংক্রান্ত বিষয়ে। আইসিসি বুধবারের সভা শেষে নিরাপত্তা বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ভেন্যুভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং আয়োজক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক আশ্বাসসহ প্রতিটি মূল্যায়নই ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে। ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য হুমকি নেই। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ভরসা করতে পারেননি আইসিসির বক্তব্যে। নিরাপত্তা বিষয়ে আইসিসির বিজ্ঞপ্তির জবাবে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, আইসিসি আমাদের যতই বলুক নিরাপত্তা আশঙ্কা নেই, আইসিসি নামে তো আলাদা কোনো দেশ নেই। যে দেশে আমার একটা ক্রিকেটার নিরাপত্তা পায়নি এবং যে দেশে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সরকারের একটা বর্ধিত অংশ, তারাই আমার ক্রিকেটারকে উগ্রবাদীদের চাপে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ বা অনীহা হয়েছে, সেই দেশেই খেলা হচ্ছে। সেই দেশের পুলিশ, সেই দেশের সিকিউরিটি এজেন্সিরই দায়িত্ব হবে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা দেওয়া।’ যুব ক্রীড়া উপদেষ্টা নিজেই নিরাপত্তা বিষয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে ওই ঘটনার পরে কী এমন চেঞ্জ হয়েছে ভারতের, যে আমরা ভাবতে পারব ভারতে আবার কোনো উগ্রবাদী আস্ফালন হবে না এবং ভারত আমাদের মুস্তাফিজকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি, আমাদের ক্রিকেটারদের, আমাদের সাংবাদিকদের, আমাদের দর্শকদের সবাইকে নিরাপত্তা দিতে পারবে? আমরা কিসের থেকে কনভিন্সড হব?’
১৯৯৯ সাল থেকে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলছে বাংলাদেশ। ২০০৭ সাল থেকে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলছে। এই প্রথম টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে অসম্মতি জানিয়েছে। অবশ্য ২০২৩ সালে ভারতের মাটিতে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেছিল বাংলাদেশ।