দীর্ঘদিন পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব এসেছে। এতে মূল বেতন দ্বিগুণসহ বড় ধরনের বাড়তির সুপারিশ থাকলেও তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বিপুল অর্থ আসবে কোথা থেকে?
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বর্তমান অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারি অর্থনীতির পাশাপাশি বেসরকারি খাতও বড় চাপে পড়তে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি, রাজস্ব ঘাটতি এবং শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কায় নতুন পে-স্কেল নিয়ে এখন আতঙ্কে রয়েছে বেসরকারি খাত।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে নেওয়া হয়নি। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে এত বড় বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সরকারি বেতন বাড়লে তার প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আমরা অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থানে নেই। সেখানে অতিরিক্ত মজুরির চাপ নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। এ চাপ সামলানো নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।’
বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা ছিল- এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এমন একটি সময়ে এ ঘোষণা এসেছে, যখন দেশ ভয়াবহ রাজস্ব ঘাটতির মুখে। সরকারকে এত বড় ব্যয় রাজস্ব থেকেই মেটাতে হবে। রাজস্ব না বাড়লে এই বিপুল পরিমাণ বেতন পরিশোধে সরকারকে ঋণের পথেই হাঁটতে হবে, যা আগামী সরকারের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়বে। এ খাতে কর্মরতদের প্রত্যাশা বাড়বে। গত এক বছরে শিল্প খাতে যে ভয়াবহ দুরবস্থা তৈরি হয়েছে, তার ধকল এখনো কাটেনি। সেই বাস্তবতায় সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের জন্য আমরাও প্রস্তুত নই। এমনিতেই আমরা উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে আছি, এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন করে আবারও সে চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় নিলে, বর্তমান সময়ে নতুন পে-স্কেলের এ সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক।’ সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল পুরোপুরি কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় ইতোমধ্যেই বাড়ানো হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দায়ভার পড়বে নির্বাচনের পর আসা রাজনৈতিক সরকারের ওপর। সেখানে একটি বড় মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। কারণ, একদিকে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা- এ দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ।
গত ২১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। ভাতা যোগ হলে ঢাকায় একজন সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মীর মোট আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪২ হাজার টাকায়। এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের জোগান। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন স্কেল পুরোপুরি কার্যকর হলে সমপরিমাণ অর্থ বা এর চেয়ে বেশি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান অবস্থায় এ অর্থ জোগাড় করা সহজ নয়। রাজস্ব বাড়াতে গেলে ভ্যাট-কর বাড়ানোর পথেই হাঁটতে হবে সরকারকে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁটের ঝুঁকিও সামনে আসবে।