সরকারি টাকা খরচ করে দেশবিদেশে সফর, বিনিয়োগ সম্মেলন ও রোড শো করা হলেও দেশে কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ। যেসব দেশ থেকে বিনিয়োগ আসে, সরকারের কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে রোড শো, বিনিয়োগ সম্মেলন করেও সেসব দেশ থেকে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসেনি। কিছু দেশ থেকে এক টাকাও বিনিয়োগ আসেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে। হ্রাস পেয়েছে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার ও সামিট আয়োজনে বিনিয়োগকারীদের ভালো সাড়া পাওয়ার কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলানোর উচ্চাশা না দেখিয়ে, নিজেদের ঢোল পেটানোতে সরকার ব্যস্ত ছিল। বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো সমাধানে কাজ করেনি সরকার। বড় ধরনের পতন বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে মোট ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল, সেখানে গত অর্থবছরে প্রকল্পের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭০টিতে। দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে এফডিআই স্টক বিবেচনায় বাংলাদেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উৎস দেশ যুক্তরাজ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটি থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। অথচ এ সময়েই যুক্তরাজ্য সফর করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং ব্রিটিশ সরকার ও শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কোরিয়া ও তুরস্কসহ যেসব দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকারি সফর হয়েছে, সেসব দেশ থেকেও গত অর্থবছরে বিনিয়োগ কমেছে। চীন থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগ আসার চেয়ে বেশি অর্থ প্রত্যাবাসিত হয়েছে, কোরিয়া থেকে নিট এফডিআই কমেছে ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং তুরস্ক থেকে কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। কাতার সফর হলেও দেশটি থেকে কোনো নতুন বিনিয়োগ আসেনি। তবে নেদারল্যান্ডস থেকে বড় একটি বিনিয়োগ হয়েছে। বেড়েছে প্রায় ১৮০০ শতাংশ যা সরকারের সফলতা হিসেবে বলা হলেও বাস্তবে এটি কোনো নতুন বিনিয়োগ নয়। আকিজ গ্রুপের টোব্যাকো ব্যবসা অধিগ্রহণসংক্রান্ত ২০১৮ সালের একটি চুক্তির বিপরীতে সময়ভিত্তিক অর্থ পরিশোধ করেছে। ফলে এ প্রবাহকে বর্তমান সরকারের বিনিয়োগ প্রচেষ্টার সফলতা দেখিয়ে এডিআই প্রবাহে বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের এ বিনিয়োগ হিসাবে নিয়ে বিডা থেকে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধনে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও জার্মানি শীর্ষে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ দেশগুলোর মধ্যে চীন ছাড়া আর কেউ শীর্ষ পাঁচে ছিল না। গত অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এরপর চীন থেকে এসেছে ৬২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব। আগের অর্থবছরে এসেছিল ৫ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪১০ কোটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩১০ কোটি ও হংকং থেকে ২২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব আসে।
কভিডকালের চেয়েও গত অর্থবছরে দেশে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯০৫টি প্রকল্পে মোট ১ লাখ ৫ হাজার ২২৬ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করা হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছিল প্রায় ১২ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে কভিডকালে প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৫টি হলেও টাকার অঙ্কে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন প্রায় ৩৮ শতাংশ কমে ৬৫ হাজার ৫৬৬ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের সংখ্যা ও বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ দুটোই বাড়ে। এ সময় ১ হাজার ১২৪টি প্রকল্পে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ১৬টি প্রকল্পে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করা হয়েছিল। বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছিল প্রায় ১৯ শতাংশ।
গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব বেড়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের একটি বিশ্বাসযোগ্য পাইপলাইন তৈরি করাই বিডার মূল কাজ। এ পাইপলাইন থেকে বাস্তব বিনিয়োগ আসতে শুরু করা উৎসাহজনক। যদিও তুলনামূলক মানদণ্ড এখনো নিচু। প্রচলিত নিবন্ধিত প্রস্তাবনার অতিরিক্ত হিসেবে ২০২৫ সালের জন্য বিডার নিজস্ব বিনিয়োগ পাইপলাইনে ইতোমধ্যে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিনিয়োগ প্রস্তাব বা প্রকৃত বিনিয়োগ কমে যাওয়া স্বাভাবিক। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ অস্পষ্টতার কারণে দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ আছে এটা বলা যায় না। সরকারের নীতি সংস্কার প্রয়োজন। তবে বিনিয়োগ নিয়ে সরকারের প্রচারের ধরন সঠিকভাবে বাস্তবতা তুলে ধরছে না। সরকার বাস্তব সমস্যাগুলো স্বীকার করে সমাধানে মনোযোগী হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ত।