দেশে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ঘটা করে আয়োজন করা হয়েছিল বিনিয়োগ সম্মেলন। সভা-সেমিনার করে, দেশিবিদেশি উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত সময়। সম্মেলন শেষে জানানো হয়েছিল, প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। ৮ মাস পর এসে জানা যাচ্ছে- ফল শূন্য। নতুন বিনিয়োগ তো আসেইনি, উপরন্তু আগের চেয়ে আরও কমে গেছে প্রকল্প প্রস্তাব নিবন্ধন। শুধু তাই নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ডেকে নিয়ে যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি দেখানো হয়েছিল, অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার বাস্তবায়ন।
এমন কি বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন যেসব দেশ সফর করেছেন- সেসব দেশ থেকেও আসেনি নতুন বিনিয়োগ; উল্টো অনেক দেশের বিনিয়োগ প্রস্তাব হ্রাস পেয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকার দেশিবিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম।
একই সময়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বড় ব্যবসায়ী ও শিল্প গ্রুপগুলোকে হয়রানি, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শিল্প-কারখানায় শ্রম অসন্তোষ, কাঁচামালের সংকট, ব্যাংকের মূলধন সংকট, এলসি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে বিনিয়োগকারীরা চরম আস্থাহীনতায় ভুগছেন।
ফলে দেশিবিদেশি বিনিয়োগে প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ একটি রূপান্তরকালীন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ দেখান না। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের জিইয়ে থাকা অবকাঠামো সমস্যাও সমাধান করা হয়নি। নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেখানো প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা : গত বছরের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে চীন, জাপান, সৌদি, আবুধাবি, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ ৩৬ বিনিয়োগকারীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে। দেখানো হয়েছিল, সরকার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে সুযোগসুবিধা ও কর্মপরিবেশ তৈরিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
৮ মাস পর ওই প্রকল্পটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী তো আসেইনি, বরং জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। আলোচ্য প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ এবং সরকারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ তুলে অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দিয়েছে জাইকা।
সভা-সেমিনারেও আসেনি নতুন প্রস্তাব : গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, কাতার, চীন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও কোরিয়া সফর করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। এর মধ্যে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র, ফেব্রুয়ারিতে জাপান, মার্চে যুক্তরাজ্য ও এপ্রিলে কাতারে যান প্রধান উপদেষ্টার প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে। এর মধ্যে কাতার থেকে কোনো বিনিয়োগ আসেনি; যুক্তরাজ্য থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে বিনিয়োগ এসেছে ফেরত গেছে তার চেয়ে বেশি। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় জাপান ও যুক্তরাজ্য থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, টেক্সটাইল ও আইটি খাতে বিনিয়োগ টানতে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান দেশটিতে সফরে যান গত বছরের জুলাইয়ে। বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও চূড়ান্তভাবে সেগুলো কার্যকর হয়নি। ফলে গত অর্থবছরে দেশটির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে ৮৯ শতাংশ। পাশাপাশি এ সময়ে দেশে চীনের নিট এফডিআই প্রবাহ কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বিডা- প্রচার-প্রচারণায় যতটা মনোযোগী ছিল-ততটা মনোযোগ ছিল না বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করার বিষয়ে। বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্তও নিতে পারেনি। অনেক সিদ্ধান্তের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত ইস্যুগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লেষকে বড় করে দেখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের খামখেয়ালি, অয়িনম-দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বেরোতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকারও। ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির কোনো উন্নতিই হয়নি।
বরং রাজনৈতিক সরকারের দেশ পরিচালনার দায়িত্বে না থাকায় আস্থার সংকট আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংশ্লেষের অভিযোগ তুলে দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলোর সঙ্গেও বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়। কারও কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। শিল্প-কারখানাগুলোতে চাওয়া হয় কোটি টাকার চাঁদা। না দিলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, খোদ সরকারের পক্ষ থেকেও অনেক ব্যবসায়ী-শিল্প গ্রুপের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে রাখা হয়। অনেক ব্যবসায়ীকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়- যে কারণে তারা ব্যাংকে মূলধন সহায়তা পায়নি; এমন কি কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি করতে গিয়েও ঝামেলায় পড়েন অনেকে। অনেক কারখানা শ্রম অসন্তোষের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়গুলো সমাধানে শিল্প-উদ্যোক্তাদের আস্থার পরিবেশ সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখেনি বিডা। এ প্রসঙ্গে বিডার চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, কোনো দেশেই বিদেশি বিনিয়োগ রাতারাতি আসে না। বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সময়ের প্রয়োজন পড়ে। বাংলাদেশের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। গত বছর আমাদের করা বিনিয়োগ সামিটের ফলাফল পেতে আমাদের আরও সময় দিতে হবে।