ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। আমাদের সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন।’ এরপর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে, শেষ হতে চলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকাল। কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি উপদেষ্টাদের কারও সম্পদের তথ্য। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল বিবিসি বাংলা অনলাইন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিম্নরূপ-
আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটির অবসান ঘটবে বলেই প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটতে দেখা যায়নি। উল্টো, একাধিক উপদেষ্টা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানান অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। যারা জবাবদিহির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের অস্বচ্ছ কর্মকাণ্ড দেশবাসী মোটেও প্রত্যাশা করেনি।’ অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এরকম একটি অরাজনৈতিক সরকার, যেখানে বিশিষ্টজনরা সরকারের ভিতরে রয়েছেন, তারা যখন জনগণের কাছের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও নিজেদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করে আগামী দিনের রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটা খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। আগামীর মন্ত্রি-আমলাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করার একটা উছিলা তৈরির সুযোগ করে দিয়ে গেলেন, যা আরও হতাশাজনক।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রতিশ্রুতি দিয়েও উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ না করে উনারা শেখ হাসিনার সরকারের মতোই আচরণ করেছেন, যা আমাদের খুবই পীড়িত ও হতাশ করেছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সম্পদের তথ্য প্রকাশের যে ঘোষণা প্রধান উপদেষ্টা শুরুর দিকে দিয়েছিলেন, সেটা আসলে ছিল একটা মুখরোচক ঘোষণা। সোজা কথায় বললে, এক ধরনের স্টান্টবাজি বা লোক দেখানো পদক্ষেপ। এ বিষয়ে তারা আন্তরিক বলে মনে হয় না।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধিকারকর্মী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এ সরকারের উপদেষ্টারা নিজেরাই অতীতে লম্বা সময় ধরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলেছেন। ফলে আমরা আশা করেছিলাম যে, তারা সেটার একটা উদাহরণ সৃষ্টি করে যাবেন। সেই সুযোগ তাদের হাতে ছিল, যা এখন হাতছাড়া হতে চলেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের আগস্টে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ‘সীমাহীন দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দেন সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। ঢাকায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের (সরকারি কর্মকর্তাদের) না হয় চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু যারা আন্দোলন করে আজকে চেয়ারে বসেছেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টার আমি তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারব। যেমন আমার সচিব আছেন দুজন, তারা (উপদেষ্টারা) সীমাহীন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে তাদের (উপদেষ্টাদের সঙ্গে) কন্টাক্ট (যোগাযোগ) করা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে কোনোরকম নিয়োগ হবে না, কোনো বদলি হবে না। আমার কাছে প্রমাণ আছে, প্রমাণ ছাড়া কথা বলি না।’ সাত্তার যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সামনে দর্শক সারিতে বসে থাকা সরকারের বর্তমান কর্মকর্তাদের ‘ঠিক, ঠিক’ ধ্বনি তুলে তাকে সমর্থন দিতে দেখা যায়।
এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়া অভিযোগকারীর কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে সেটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদাবাজির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এর আগে, সজীব ভূঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়ে অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়। একইভাবে, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আতিক মোর্শেদ, যিনি আগে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন, তার বিরুদ্ধেও দেড় শ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে দেখা যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করার কথা জানানো হলেও গত ১০ মাসে সেটার কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে তার হাতে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, সেটা নিয়েও নানা সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আগে মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজন তাদের ব্যাপারে কোনো বিষয় উঠলে যেরকম খুব দ্রুত গতিতে সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যেত, এখন যদি আমরা প্রধান উপদেষ্টার বেলাতেও একই জিনিস দেখি, তাহলে পরিবর্তনের কী নমুনা এখানে হাজির হলো?’ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় গ্রামীণের প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগসুবিধা পেয়েছে, সেটি পরিষ্কার ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এটা না করলে প্রশ্নটা থেকেই যাবে।’
অপরদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ‘গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূস কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করেননি।’ অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমি মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এখনো সুযোগ আছে। চলে যাওয়ার সময়ও যদি উনারা এ তথ্যটা প্রকাশ করে যান যে, ক্ষমতাগ্রহণের সময় তাদের কাছে কী পরিমাণ সম্পদ ছিল এবং কতটুকু সম্পদ নিয়ে উনারা দায়িত্ব ছাড়ছেন, তাহলে আগামীর সরকারের জন্য সেটা একটা ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে পারবেন।’