ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা থাকলেও দেশের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এক গবেষণায় সংস্থাটি জানায়, দেশের ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন হলেও প্রায় ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ নিজেকে চরম অনিরাপদ মনে করে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন : রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক গবেষণা ফল প্রকাশ করা হয়।
সিজিএস জানায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৫০৫ জন সংখ্যালঘু অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে ভোটদানের আচরণ, রাজনৈতিক সচেতনতা, নিরাপত্তাবোধ ও প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে পরিসংখ্যানগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ জানিয়েছে ভোটে অনিয়ম হলে তারা ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জানাবেন, ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করবে এবং ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নিরাপত্তা বাহিনীকে অবহিত করবে। ২০ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছে, তারা কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব থাকবে। মাত্র ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কথা বলেছে, ১২ দশমিক ৫ শতাংশ গণমাধ্যমকে জানাবে এবং ১১ দশমিক ২ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরবে বলে জানিয়েছে। গবেষণার ফলাফলে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক হয়রানি বা হুমকির ঘটনায় অভিযোগ জানানোর প্রবণতাও অত্যন্ত কম। অভিযোগ জানানো হলেও তা মূলত সামাজিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে। জরিপে ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছে, তারা কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি যাতে অভিযোগ জানানো প্রয়োজন হয়েছে। তবে যারা হুমকি বা সহিংসতার শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে ২২ শতাংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে এবং কোনো অভিযোগ করেনি। মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ নির্বাচন কমিশনে এবং ১ দশমিক ৫ শতাংশ থানায় অভিযোগ করেছে। জরিপ অনুযায়ী, অভিযোগের পর আরও বিপদের আশঙ্কাই সবচেয়ে বড় বাধা। ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করে, অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে আরও ক্ষতির শিকার হতে পারে। পাশাপাশি ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থা না থাকার কথা জানিয়েছে। ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ জানিয়েছে, পরিবার, সমাজ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না। ২০ দশমিক ২ শতাংশ মনে করে, প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না। জরিপে আরও দেখা যায়, ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করে অভিযোগ করলেও কোনো বিচার বা প্রতিকার পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এসব তথ্য নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর গভীর অনাস্থার ইঙ্গিত দেয়।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আরও প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইশতেহার দিতে পারত। তবে যেটুকু এসেছে, সেটিও একেবারে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। কিন্তু জবাবদিহি না থাকলে যত ইশতেহারই দেওয়া হোক, তার কোনো কার্যকর মূল্য থাকে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার যে ঘাটতি রয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন। বাংলাদেশ এখনো একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম। পেছনে পড়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নির্বাচনের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বলই থেকে যাবে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন সংস্কারের বিষয়ে বহু প্রস্তাব ও সুপারিশ উঠে এলেও সেগুলোর বড় অংশই বাস্তবে কার্যকর হয়নি। ফলে আসন্ন নির্বাচন সত্যিকার অর্থে কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে- সে বিষয়ে গুরুতর সংশয় থেকেই যাচ্ছে। নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। ভোট কেনাবেচা, চাপ প্রয়োগ ও কারচুপির অভিযোগ নিয়মিতভাবেই উঠে আসে। একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আইন ও বাস্তব- উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সিজিএসের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান বলেন, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের সময় তারা গভীর নিরাপত্তাহীনতা, কাঠামোগত বর্জন এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকটে ভোগেন। রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘুদের প্রায়ই ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায় বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত নগণ্য।