নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে জুলাই অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট বা মূল লক্ষ্য ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, গণভোট নিয়ে আইনি বিভ্রান্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
টিআইবি মনে করছে, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশবাসীর মনে যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসি ও সরকারের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা। আইনি বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে অভ্যুত্থানের মূল ম্যান্ডেট এখন ঝুঁকির মুখে।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি : টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৩০টি রাজনৈতিক দলে কোনো নারী প্রার্থী নেই। বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে ২ দশমিক ৮ শতাংশ নারী, জাতীয় পার্টি ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং এনসিপির মনোনয়নে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ নারী রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এই হার ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকারের পরও বাস্তবে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ছোট দলগুলোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী মনোনয়নের হার বেশি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বের গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাচ্ছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং অনলাইন-অফলাইন উভয় ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ ছাড়া প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানির বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এদিকে গণভোট ইস্যুতে সরকারের দোদুল্যমানতা নিয়েও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। উভয় পক্ষকে খুশি করতে গিয়ে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের উদ্দেশ্যকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে। এ ছাড়া একই দিনে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করেছে।
নির্বাচন কমিশন গণভোটকে সাধারণ নির্বাচনের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করছে, যা আইনিভাবে সঠিক নয়। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গণভোটে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা আসনের পক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিআইবি জানিয়েছে, গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট সরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। ব্যবসায়িক স্বার্থ বা অর্থের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে নমনীয় থাকছে। ইসির সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ না থাকায় নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সংবাদ সম্মেলনে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে পাওয়া ‘জুলাই সনদ’কে গণভোটের মূল ভিত্তি করার প্রস্তাব দেয় টিআইবি।