‘আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে।’ সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম-খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় দেওয়া জবানবন্দিতে এমন আক্ষেপ করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এ মামলায় প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী হিসেবে গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেছেন তিনি। পরে তার অসমাপ্ত জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে এই মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে জিয়াউল আহসানের বিচার শুরু হয়। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের পক্ষে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এ সময় জিয়াউল আহসানের সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও আইনজীবী নাজনীন নাহার উপস্থিত ছিলেন। ধার্য তারিখ থাকায় সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় মামলার একমাত্র আসামি মেজর জেনারেল (চাকরিচ্যুত) জিয়াউল আহসানকে।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর তারেক রহমানকে উঠিয়ে এনে নির্যাতনের পর থেকে বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখা অভ্যাসে পরিণত হয় উল্লেখ করে জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থায় সেনা সদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং উপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা জন্ম হয়।
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। নিজের সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নেই যে, ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে তবে সেটা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হচ্ছে বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়ে সময়ে মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া দুর্যোগকালীন সময়েও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। এমনকি নির্বাচনকালীন সময়েও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সেনাবাহিনীকে বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মিশিয়ে ২০০৩ সালে র্যাব গঠন করা একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত ছিল উল্লেখ করে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, প্রত্যেক সেনাসদস্যের কাছে মারণাস্ত্র থাকে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রশিক্ষণকালে তাদের অমানবিক করা হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ না হলে তারা যুদ্ধ করতে পারবে না। তিনি বলেন, সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। পরবর্তীতে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এ ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিডিআর বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এ বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে। পেশাদার অফিসারদের একপাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।’
শেখ হাসিনা নিজের আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট হন উল্লেখ করে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘তারিক সিদ্দিক অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।’ র্যাবের বিষয়ে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘যখন বেনজীর আহমেদ র্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন তখন র্যাবের পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশার হিসেবে আছেন) কে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান তিনি কথা বলেছেন কিন্তু কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তার কাছ থেকে পাননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে জানান কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর মাথা ইট ও পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা।’
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে জিয়াউল আহসান, মেজর জেনারেল সিদ্দিক ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে। দুজন অফিসারকে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শাস্তি দেওয়ার জন্য র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও সে তাদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। আমি জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি।’ তিনি বলেন, ‘আদেশ কার্যকরী করার জন্য লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দেই। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিককে না জানানোর জন্য তার বিরাগভাজন হন। অচিরেই আমি এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জিয়াউল আহসানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে নেওয়ার জন্য। আমি না বলেছি। আমাকে তখন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন জিজ্ঞাসা করেন কোন চাকরিতে অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা কি বিশেষ পদক্ষেপ? আমি বলি হ্যাঁ এটি বিশেষ পদক্ষেপ এবং তুমি যদি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য কর তাহলে তোমারও একই অবস্থা হবে। দুই দিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য আমি নিজে থেকেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই।’