সেনাবাহিনীর গৌরব আর সম্মানের আড়ালে সেনা কর্মকর্তারা যাতে অপকর্ম করতে না পারে, সেজন্য পুলিশের বিশেষায়িত ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করা দরকার বলে মনে করেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আর আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ায় দেশের প্রধান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে। এজন্য ডিজিএফআইয়েরও বিলুপ্তি চেয়েছেন তিনি। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এমন মতামত তুলে ধরেন।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী হিসেবে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দি দেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। রবিবার জবানবন্দি শুরু করেন তিনি। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যে তিনি বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহম্মেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ায় ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের কার্যালয় পরিদর্শন করত। এমনকি ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ের মিটিং রুমে বসে ‘র’-এর ব্যক্তিদের কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে সেই তালিকা ডিজিএফআইকে দিত। র্যাবে কাজ করেছেন, এমন তিনজন সেনা কর্মকর্তার নাম প্রকাশ না করে সাক্ষ্যে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, সাক্ষাতে এই তিন কর্মকর্তাই স্বীকার করেছেন, র্যাবে গিয়ে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি র্যাব যাদের হত্যা করত তাদের পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে ইটপাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত।’ তিনি বলেন, ‘র্যাবের এসব কর্মকা দেখে আমি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকি এবং অফিসারদের এসব কর্মকা থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করি। একপর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে তাদের ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদের স্মরণ করিয়ে দিই শেখ মুজিব এবং জিয়া হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দ মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছে। এতকিছুর পরও যখন বুঝতে পারি ক্রসফায়ার থামছে না তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র?্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা (র্যাবে) এবং পোস্টিং বন্ধ করে দিই। আমাকে অনেকে মনে করিয়ে দেন যে, আমি যা করছি তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল যে, হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।’ সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া সাক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালকে জানান, ‘র্যাবে পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আমাকে র্যাবে সেনা কর্মকর্তাদের পোস্টিং দিতে বলেছিলেন। কিন্তু কর্মকর্তা স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছিলাম। অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।’