আগামীকাল ভোটের দিন। ভোট গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব। ভোটের মাধ্যমেই একটা দেশের নাগরিকরা জানিয়ে দেন যে তারাই প্রজাতন্ত্রের মালিক। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় আয়োজন হোক উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ এবং আনন্দময়। কাল দিনভর আমরা কোনো সহিংসতার খবর শুনতে চাই না। ভোট কেন্দ্র দখল, কারচুপির অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ চাই না। এ দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে চায়। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাহীন জীবন চায়। নির্ভয়ে তাদের মতপ্রকাশের অধিকার চায়। অবাধে চলাফেরা করতে চায়। এই নির্বাচন যেন হয় সেই স্বপ্নযাত্রার সূচনা।
বাংলাদেশের মানুষ বড়ই দুর্ভাগা। এ দেশের মানুষ কঠিন পরিশ্রম করে সোনালি স্বপ্ন বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু রাজনৈতিক বিভেদ আর হানাহানির কারণে সেই স্বপ্ন ধূসর হয়ে যায়। বেদনায় নীল হয় সবুজ জমিন। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে রাজনীতির নামে এদেশকে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিহিংসার আগুনে পুড়েছে নিরীহ মানুষ। বাংলাদেশ পৌঁছতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। বিভাজন আর ঘৃণার রাজনীতি আমাদের উন্নয়নকে করেছে বাধাগ্রস্ত। রাজনৈতিক বিভাজন পিছিয়ে দিয়েছে শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজকে। এই নির্বাচন সব বিভাজনের অবসান ঘটাক। শুরু হোক নতুন বাংলাদেশের পথচলা।
নানা কারণে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের নির্বাচন। এই নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়, নতুন পথের সূচনা। যে পথের জন্য ২৪ এর জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিল হাজারো মানুষ। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। দুর্নীতি মুক্ত দেশ। এমন একটি দেশ যেখানে সব মানুষের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে আমরা সেই আকাঙ্ক্ষার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারিনি। বরং নতুন অস্থিরতা আমাদের নিয়ে গেছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। একজন কৃষক আশা করেছিল ২৪ এর আগস্টের পর নতুন বাংলাদেশে তিনি ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন। সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি থাকতে হবে না তাকে।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে, তার সামান্য লাভের টাকায় চাঁদাবাজদের থাবা বন্ধ হবে। একজন মাঝারি ব্যবসায়ী আশা করেছিলেন সরকারি অফিসে কাজের জন্য তাকে আর ঘুষ দিতে হবে না।
লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন যে শিল্প উদ্যোক্তা, তিনি ভেবেছিলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ হবে। ব্যবসা করার জন্য সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। বন্ধ হবে পদে পদে বাধা আর হয়রানি। সহজেই গ্যাস বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, ব্যাংকগুলো হবে বিনিয়োগবান্ধব। রাজনৈতিক কারণে হয়রানি বন্ধ হবে, বৈষম্যহীন বাংলাদেশে। একজন শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখেছিলেন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, মাস্তানি বন্ধ হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে। বিশ্বমানের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একজন বেকার যুবক ভেবেছিলেন তার দুঃখের দিন শেষ হবে। স্বৈরাচার মুক্ত দেশ তার চাকরির ব্যবস্থা করবে। ঘুষ কিংবা তদবির ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাবেন। একজন নারী আশা করেছিলেন, নতুন দেশে বন্ধ হবে নারীর প্রতি সহিংসতা। রাস্তাঘাটে নারীরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। সমাজ মাধ্যমে নোংরা ভাষায় নারীদের অবমাননা বন্ধ হবে। একজন সাংবাদিক আশাবাদী হয়েছিল, মন খুলে সত্য প্রকাশ করতে পারবে ভেবে। ২৪ এর আগস্ট আমাদের স্বপ্নের পরিধি অনেক বিস্তৃত করেছিল। আমরা আশা করেছিলাম, রাতে নিরাপদে বাড়িতে ঘুমাতে পারব। বাজারে সাধ্যের মধ্যে থাকবে জিনিসপত্রের দাম। হাসপাতালে গিয়ে সুচিকিৎসা পাব। আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠবে মাদকমুক্ত সমাজে।
এদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া খুবই কম। আমরা কেউই আশা করিনি যে, সব স্বপ্নের ফুল একসঙ্গে প্রস্ফুটিত হবে। আমাদের আশা ছিল, এসব স্বপ্ন পূরণের পথে যাত্রা শুরু হবে।
কিন্তু কী পেলাম আমরা?
গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের বুকজুড়ে আশাহতের হাহাকার। নতুন বাংলাদেশ বিভক্ত হয়েছে, আর এই বিভক্তির প্রকাশ ঘটেছে বীভৎসভাবে। পেশিশক্তির উন্মত্ততার কাছে পরাজিত হয়েছে মানবিক মূল্যবোধ। নতুন বাংলাদেশে বৈষম্য বন্ধ হয়নি, বরং নতুন শোষকের সৃষ্টি হয়েছে। মব বাহিনীর কাছে অসহায় মানুষ বিচার পায়নি। বেকার তরুণ চাকরি পায়নি। নতুন করে বেকার হয়েছে আরও অনেকে। চাকরির জন্য এখনো ঘুষ দিতে হচ্ছে, করতে হচ্ছে তদবির।
চাঁদাবাজির কবল থেকে মুক্ত হয়নি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে বড় শিল্পপতি, কেউই। বরং চাঁদাবাজি বেড়েই চলেছে। ব্যবসায়ীদের দোসর বানিয়ে নির্বিচারে হয়রানি করা হচ্ছে। বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান মব সন্ত্রাসীরা আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করেছে। ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে বহু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। মামলা-বাণিজ্য করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, ঘুষের রেট বেড়েছে।
নতুন বাংলাদেশে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়নি। শিক্ষার্থীরা পায়নি শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনে মারামারি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শিক্ষকরা ভয় পান শিক্ষার্থীদের। বহু শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন। চরম অপমানিত হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে গেছেন বহু শিক্ষক। নারীদের জন্য নিরাপদ হয়নি এই দেশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছেন, মবের শিকার হয়েছেন। নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা এখন ভয়েই কেউ বলে না। স্বাধীন মতপ্রকাশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ। গণমাধ্যমে বিরাজ করছে আতঙ্ক। আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, ডেইলি সান, নিউজ টোয়েন্টিফোর, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম। বহু সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন ভিন্নমতের কারণে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। বহু দেশ এখন বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দিচ্ছে না। সর্বত্র মব সন্ত্রাস। কথায় কথায় দাবি আদায়ের নামে রাস্তা বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের অনেক চুক্তি এবং কেনাকাটায় অসচ্ছতার অভিযোগ করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
এরকম একটি দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নির্বাচনই একমাত্র পথ। একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন সবাই। তাই এই নির্বাচন অন্য যেকোনো সময়ের নির্বাচনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তাই এদেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ক্ষমতা দখলের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, দেশে একটি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক এবং হতাশা থেকে জনগণকে মুক্ত করা। দেশকে বাঁচানোই হওয়া উচিত এই নির্বাচনের মূল লক্ষ্য।
এ কারণেই জনগণ প্রত্যাশা করে, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের অভিপ্রায় অনুধাবন করবে। ভোটের দিন কোনো রাজনৈতিক দল যেন জনগণের ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা না করে। ভোট কেন্দ্র দখল, জাল ভোট কিংবা অন্য যেকোনো কারচুপি থেকে বিরত থাকে।
ভোটারদের উপস্থিতি এবং উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে হলে প্রার্থীদের সংযত আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ যাকে খুশি ভোট দিক, এই মানসিকতা থাকতে হবে সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের। আজ যদি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়, তাহলেই কেবল শান্তির পথে এগোবে দেশ। জনগণের রায় নিয়ে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারবে। নতুন সরকার দেশকে নিয়ে যাবে শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং সমৃদ্ধির পথে। আর বিভক্তি নয়, আর প্রতিহিংসা নয়।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হোক গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়। আমরা ভোটের উৎসব চাই। নির্বাচনের পর শান্তির মাতৃভূমি চাই।