আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সব বাহিনীর সমন্বয়ে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এজন্য বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত করা হয়েছে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা মাঠে আছেন। থাকবেন ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। চলছে যৌথ বাহিনীর ‘ফুট প্যাট্রল’ মহড়া। এ ছাড়া নির্বাচনি দায়িত্বে থাকছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। কোনো কেন্দ্রে সহিংসতা বা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলেই ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে স্থগিত করা হবে ওই আসনের নির্বাচন। নির্বাচনসংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় করতে স্থাপন করা হয়েছে পৃথক ডেস্ক। ট্রিপল নাইনে (৯৯৯) কল করে সেখানে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি চালু করা হয়েছে নির্বাচন বন্ধু হটলাইন ট্রিপল থ্রি (৩৩৩)।
‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ সম্পর্কে অবহিত করতে গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচন আয়োজনে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নির্বাচনি সহিংসতা ঠেকাতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।’ এ সময় তিনি জানান, সারা দেশে ৮ হাজার ৭৭০টি ভোট কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৫ হাজার ২৩০টি মধ্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোট কেন্দ্রে রয়েছে। ৯০ ভাগ কেন্দ্রে সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ড্রোন ব্যবহার করে কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পুলিশপ্রধান বলেন, নির্বাচন কেন্দ্র করে যেকোনো অস্ত্রই হুমকি। এর বাইরেও বিভিন্নভাবে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। সেসব মোকাবিলা করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বৈধ ২৭ হাজার ৯৯৫টি অস্ত্র জমা নেওয়া হয়েছে। থানা থেকে লুট হওয়া বেশির ভাগ অস্ত্রই উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে যেন ভোট হয়, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবার নির্বাচনে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোট কেন্দ্র, ভ্রাম্যমাণ ও স্ট্রাইকিং ফোর্স এ তিনটি স্তরে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার নিরাপত্তা রক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইজিপি বলেন, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, সর্বোপরি আনসার বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত সবচেয়ে বড় সংখ্যার বাহিনী হচ্ছে আনসার। এ সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। ১ লাখের বেশি সেনাসদস্য মাঠে থাকছেন। রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের মাধ্যমে সব বাহিনীর সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ সময় তিনি জানান, ‘তফসিল ঘোষণার পর থেকে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন পাঁচজন, আহত হয়েছেন ৬০৩। আমরা সব ধরনের সহিংসতা কমিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
এদিকে গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী বিশেষ ‘ফুট প্যাট্রল’ মহড়া দিয়েছে। মহড়াটি আবাহনী মাঠ এলাকা থেকে শুরু হয়ে ধানমন্ডি-১০ আসনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা ও ভোট কেন্দ্রগুলো প্রদক্ষিণ করে। টহল শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মামুন খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিগত সময়ের তুলনায় এবারের নির্বাচন অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হবে। বর্তমানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার শঙ্কা নেই এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনের আমেজ বিরাজ করছে। একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা যেন কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই এ মহড়ার মূল উদ্দেশ্য।’ জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যৌথ বাহিনীর ‘ফুট প্যাট্রল’ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নির্বাচনে ভোটারসহ সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে যৌথ বাহিনী। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ভোটাররা যেন নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক টহল কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি কোনো দুষ্কৃতকারী বা কুচক্রী মহল যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেন।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৮ দিনব্যাপী কাজ করবে কোস্টগার্ড। বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহল ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা দমনে সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে কোস্টগার্ড। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপপরিচালক (মিডিয়া) মো. আশিকউজ্জামান বলেন, সারা দেশের ভোট কেন্দ্রে জরুরি মুহূর্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১ হাজার ১৯১টি সশস্ত্র টিম স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে।