আজকের বাংলাদেশের ভোরটা অন্যরকম। আজকের বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ একটি নতুন দিনের প্রত্যাশায় দিন শুরু করবে। আজকের দিনে মানুষ হতাশার অন্ধকার থেকে নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করবে। আজ এ দেশের প্রতিটি মানুষ নতুন বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, আজকের নির্বাচনে যারাই জয়ী হোক না কেন, তারা মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ষড়যন্ত্র আর বিভক্তি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে কাজ শুরু করবে প্রথম দিনই।
এ দেশের মানুষ বারবার প্রতারিত হয়েছে। বারবার তাদের আশাহত করা হয়েছে। মানুষ আর আশাভঙ্গের বেদনায় মলিন হতে চায় না। মানুষ আর প্রতারিত হতে চায় না।
আজ নির্বাচনে যে দল বিজয়ী হবে, তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকবে একটাই-তারা বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে সামনের দিকে, সব ক্ষেত্রে।
’২৪-এর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরও এ দেশের মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। বৈষম্যহীন এক ঐক্যের বাংলাদেশ চেয়েছিল। শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসও আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আর বিভক্তি নয়, বাংলাদেশ হবে এক পরিবার।’ তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে বিশ্বের উদাহরণ।’ কিন্তু গত ১৮ মাসে এসব সুন্দর কথার বাস্তবায়ন হয়নি। বরং হিংসার আগুনে দগ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ। অদূরদর্শিতা আর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।
শুরু থেকেই মব সংস্কৃতি এমনভাবে চলেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে একটি শক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে।
বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু আর মব সন্ত্রাস। এ সময়ে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এমনকি এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বসতবাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দীপুচন্দ্রকে হত্যা এবং পরপর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।
দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, আজ নির্বাচনের মাধ্যমে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন, তারা মব সন্ত্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করবেন। সন্ত্রাসমুক্ত এক বাংলাদেশের যাত্রা হবে আজ।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই সারা দেশে ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও সুফি-দরবেশ-বাউলদের মাজার আক্রান্ত হতে শুরু করে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ১৮ মাসে বারবার আলোচনায় এসেছে।
এক বছর আগে ২০২৫ সালের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসে দেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিল পুলিশ।
এর পরেও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উল্টো নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার নিয়ে তুলকালাম ঘটেছে। জনগণের আশা, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই এসব অরাজকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের পুরো সময়ই বিভিন্ন সময়ে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে নারী সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট ঘিরে নারীদের আক্রমণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় নারীদের হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছর মার্চে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, ‘সম্প্রতি নারীদের ওপর যে জঘন্য হামলার খবর আসছে, তা গভীর উদ্বেগজনক। এটি নতুন বাংলাদেশ-এর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।’
কিন্তু তার পর থেকে সেই পরিস্থিতির আদৌ উত্তরণ হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন আছে।
নারীর সমতার ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাই এসেছে এ সরকারের সময়ে। কারণ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
আজ এ দেশের নারীদের আশা, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, দেশকে নারীদের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য করবে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে। দেশের মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ চায়। সেই আশা নিয়েই আজ তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’ সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের শুরু থেকেই ঢালাও হত্যা মামলা এবং এসব মামলায় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে জড়িত করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে অনেক হত্যা মামলা হয়েছে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রশ্নবিদ্ধভাবেও অনেককে আটক রাখা হয়েছে, যার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। যেসব মামলায় বিচার হচ্ছে, তা-ও কতটা প্রভাবহীন ও স্বচ্ছ সেই প্রশ্নও আছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, মামলা বাণিজ্যের ভয়াবহ ব্যাধি থেকে জাতিকে মুক্তি দেবে নতুন সরকার।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ সরকার নিজেদের সফল দাবি করে। অর্থ উপদেষ্টা নিজেই নিজেকে ৭০ নম্বর দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র তেমন সাফল্যের নয়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, সেটি এখন বেড়ে ২১ শতাংশের ওপর চলে গেছে।
আর বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে এখন ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশে বেকারত্ব বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এ সময়ে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির মোট ঋণের ৩৩ শতাংশের বেশি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেছে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। ব্যাংকঋণ নিরুৎসাহ করতে বাড়ানো হয় সুদের হার। সরকারের এমন নীতির কারণে গত দেড় বছরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। বেসরকারি খাত এখন সবচেয়ে সংকটকাল অতিক্রম করছে। একে তো মামলা-হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে ঢালাও মিথ্যা হত্যা মামলা করা হয়েছে। কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে হয়রানি করা হয়েছে শুধু প্রতিহিংসার কারণে। জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদের হার কঠিন করে তুলছে ব্যবসা। হয়রানি আর মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে বেসরকারি খাতে সৃষ্টি হয়েছে আস্থার সংকট। শিল্পোদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা যখন সরকারের দ্বারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এটা কেবল একজন ব্যবসায়ীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এখন চরম সংকটে।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, আজকের দিনটি অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির সূচনা দিন হবে। নতুন সরকার এসে বেসরকারি খাতকে আস্থায় নিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন পথে যাত্রা করবে।
গত ১৮ মাসে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শিক্ষাঙ্গনে ক্লাস হয় না। শিক্ষাঙ্গনে মারামারি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শিক্ষকরা ভয় পান শিক্ষার্থীদের। বহু শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন। চরম অপমানিত হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে গেছেন বহু শিক্ষক। সবাই আশায় বুক বেঁধে আছেন যে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হবে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
আন্তর্জাতিক পরিম লে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। বহু দেশ এখন বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দিচ্ছে না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এখন তলানিতে। বাংলাদেশে পররাষ্ট্রনীতি যেন পথহারা। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আজ চরম সংকটে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা, তারা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি-সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়-ফিরিয়ে আনবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট হবে।
১৮ মাসে ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ছিল হতাশার চিত্র। রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে খেলাধুলা মুক্ত রাখতে পারেনি অন্তর্র্বর্তী সরকার। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আজ দেশের মানুষ আশা করে নতুন সরকার এসে ক্রীড়াঙ্গনে ফিরিয়ে আনবে শৃঙ্খলা। খেলাধুলাকে রাজনীতিমুক্ত রাখা হবে নতুন বাংলাদেশে।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ছিল আতঙ্ক আর উদ্বেগ। উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে বাতিল হয়েছে কনসার্ট, নাটক। হেনস্তার শিকার হয়েছেন শিল্পীরা। এ দমবন্ধ অবস্থার অবসান চান দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। আজ সকালে দেশের সব সাংস্কৃতিক কর্মী কামনা করবেন, নতুন সরকার হোক সংস্কৃতিবান্ধব।
স্বাস্থ্য খাতে বিরাজ করছে নৈরাজ্য। সরকারি হাসপাতালে চলছে অস্থিরতা। ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন। এ পরিস্থিতি বদলে যাবে নতুন বাংলাদেশে, এ আশা নিয়েই আজ ভোট দিতে যাবেন ভোটাররা।
১৮ মাস ধরে গণমাধ্যমে আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলা ঘটেছে। মবের শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ভিন্নমতের ওপর প্রকাশ্যে আক্রমণের ঘটনায় সরকার ছিল নীরব। দেশের মানুষ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়। মুক্ত গণমাধ্যম চায়। গণমাধ্যমকর্মীরা প্রত্যাশা করেন, আজ হবে গণমাধ্যম মুক্তির দিন।
আমরা এক ঐক্যের দেশ চাই, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমরা এমন এক দেশ চাই, যেখানে আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত হবে প্রত্যেক নাগরিকের। আজকের দিনটি হোক সেই প্রত্যাশা পূরণের।