ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে ফলই আসুক না কেন, তা মেনে নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এর প্রাক্কালে গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটদান শুধু নাগরিক অধিকার নয়, এটি একটি দায়িত্বও। আমি আশা করি আপনারা সকলে সচেতনভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি আহ্বান-শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার্থে সকলে দায়িত্বশীল ও যত্নবান হবেন।’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতকে স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভিন্নমত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি স্বাভাবিক বিষয়। এ বিষয়টি স্মরণে রেখে আপনারা উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে আসবেন, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে জয়পরাজয় মেনে নেবেন।’ ভোটার, প্রার্থী, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক, সেবা প্রদানকারী সংস্থা, ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্ট সবার উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘ব্যক্তিগত কষ্ট-ক্লেশ তুচ্ছ করে জাতীয় নির্বাচনের এই মহতী ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করে সার্থক করে তুলুন।’ নির্বাচনে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাই। যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা মোকাবিলায় নির্বাচন কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করুন।’ ভাষণের শেষে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের সাক্ষী হতে পারব-এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।’
ভোট গ্রহণ ও গণনা হবে স্বচ্ছ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনকানুনের মধ্যেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, নির্বাচনে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ভোট গ্রহণ এবং গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেবে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য আমরা এ পর্যন্ত যা করেছি, জাতির কাছে যে ওয়াদা দিয়েছি, সেই লক্ষ্যে আইনকানুনের মধ্যে থেকেই কাজ করছি। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কাজ করছি। সুতরাং আমাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। এ নির্বাচনে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ ৪৫টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। ৬০ জনের বেশি কর্মকর্তা ও প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন, যার মধ্যে প্রায় ২২০ জন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। এ ছাড়া ১৬০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন কাভার করছেন। দেশীয়ভাবে ৮১টি নিবন্ধিত সংস্থার ৪৫ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক ও ৬০ হাজারের বেশি সাংবাদিকের অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। সব অনুমোদনের প্রক্রিয়া যথাযথ যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, আমাদের যাত্রার শুরু থেকেই স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যার মাধ্যমে কোনো বিচ্যুতি থাকলে তা চিহ্নিত করা সম্ভব। এভাবে আপনাদের সম্পৃক্ততা এ নির্বাচনে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আপনাদের পেশাদারি, নিরপেক্ষতা ও গঠনমূলক সম্পৃক্ততার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সিইসি আরও জানান, ভোট গ্রহণ শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ভোট কেন্দ্রেই গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে এবং পরে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তা সংকলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবেন। এভাবে ভোট গ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। লিঙ্গ, বয়স বা পটভূমি-নির্বিশেষে সব ভোটারকে অবাধে ভোটে অংশগ্রহণের আহ্বানও জানান তিনি।