ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে এবার নতুন এমপিদের শপথের পর মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পালা। নতুন এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ সচিবালয় সব প্রস্তুতি নিয়েছে। এবার রাষ্ট্রপতির মনোনীত প্রতিনিধি শপথ পড়াতে পারেন। সংসদ নির্বাচন গেজেটের পর যে কোনো সময় শপথ অনুষ্ঠান হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এমপিদের শপথ অনুষ্ঠান হতে পারে আগামীকাল। আর আগামী বুধবারের মধ্যেই নতুন সরকারের মন্ত্রিপরিষদ গঠন হতে পারে। নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফল ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের আদেশের পর চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফল ঘোষণা করা হবে। এবার ২৯৭ আসনের মধ্যে ২০৯টি পেয়ে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি। ফল আসার পর থেকে সব মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে কবে হবে নতুন এমপিদের শপথ, কবে নেবে দায়িত্ব।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আমাদের পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। যদি দুই দিন সময় পাওয়া যায় তবে এক বা একাধিকবার শপথ অনুষ্ঠানের রিহার্সালও সম্পন্ন করা হবে। আর নির্দেশনা এলে যে কোনো সময় শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে, সেভাবে সব প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৪ সালে গণ অভ্যুত্থানের সময় সংসদের ভিতরে প্রবেশ করেছিল আন্দোলনকারীরা। এতে অনেক কিছুর ক্ষতি হয়। ইতোমধ্যেই সংসদের ভিতরের ভাঙাচোরা অনেক অংশ মেরামত করা হয়েছে। ঠিক করা হয়েছে শপথ কক্ষ। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শপথের আনুষ্ঠানিকতা, প্রটোকল, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দপ্তর সমানতালে কাজ করছে। স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিসকক্ষ, সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষ, অধিবেশন কক্ষ ও শপথ কক্ষ ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়েল সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু করেছি। আমাদের যেদিন বলা হবে, সেদিনই শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারব।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত ডিসেম্বর থেকে তাদের শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনেও সংসদ সচিবালয়ে কাজ করতে হচ্ছে অনেকের। নতুন এমপিদের শপথ শেষ হলে ছুটির দিনে কাজ করা বন্ধ হবে বলেও মনে করছেন কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যেই শপথ অনুষ্ঠান সামনে রেখে জাতীয় সংসদ ভবনে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোগত সংস্কারের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক) অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল গেজেটে প্রকাশের পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিতে হয়। তবে কে শপথ পড়াবেন সেটি নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বর্তমানে মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। আর ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে। যদিও গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, নির্বাচিত এমপিরা সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কাছে শপথ নিলেও চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান পরিস্থিতির কারণে এবার সেটি হচ্ছে না। এবার নির্বাচিত নতুন সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি হিসেবে প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিতে পারেন।
আইন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আমাদের আইনে আছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার যদি শপথ গ্রহণ করাতে না পারেন, প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্ট মনোনীত ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাবেন। আরেকটি হচ্ছে, তিন দিনের মধ্যে যদি এ শপথ না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ করাতে পারবেন। বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি শপথ পড়াবেন। সে হিসেবে বর্তমান বা সাবেক কোনো প্রধান বিচারপতি এ শপথ পড়াবেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। শপথের পরেই নতুন সংসদের অধিবেশন ডাকার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংবিধান অনুযায়ী শপথ গ্রহণের পর নির্বাচিত ব্যক্তিরা সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য হলেও তাদের কার্যকাল শুরু হবে সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন থেকে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কারণে কে শপথ পড়াবেন তা ঠিক করবে সরকার। আইন বিভাগ ও সংসদ বিভাগ বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে জানাবেন। তখন রাষ্ট্রপতি একজনকে মনোনিত করবেন। তিনিই নতুন এমপিদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন।
নতুন মন্ত্রীদের জন্য অর্ধশত গাড়ি প্রস্তুত : নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হচ্ছে আগামী বুধবারের মধ্যেই। ইতোমধ্যেই নতুন মন্ত্রীদের জন্য ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রেখেছে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর। যারা মন্ত্রিসভায় ডাক পাবেন সেই নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসব গাড়ি পাঠানো হবে। সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. খায়রুল কবীর মেনন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন সরকার গঠন হবে সে কারণে প্রস্তুতি রাখতে হয়। সে প্রস্তুতিটাই রেখেছি। গাড়ির সংখ্যা জানতে চাইলে বলেন, এটা মন্ত্রিপরিষদ যা সরবরাহ করতে বলবে আমরা সেটাই করব, সে প্রস্তুতি আছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও যানবাহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কমপক্ষে ৫০টি গাড়ি আগাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আরও লাগলে তা বাড়ানো হবে। প্রস্তুত করা বেশির ভাগ গাড়ি ক্যামরি ও ল্যান্সার ব্র্যান্ডের। গাড়ির সঙ্গে চালকও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন এসব চালক নতুন মন্ত্রীদের জন্য অপেক্ষায় আছেন। আগামীকাল এসব চালককে ব্রিফ করবেন পরিবহন কমিশনার।
অভিজ্ঞ ও নতুনদের সমন্বয়ে হতে পারে ছোট মন্ত্রিপরিষদ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর দেশে নতুন সরকার গঠন করতে চলেছে বিএনপি। সরকার পরিচালনায় দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নতুনদের সমন্বয়ে ছোট পরিসরে গঠিত হতে পারে এই মন্ত্রিপরিষদ। প্রাথমিকভাবে ছোট হলেও প্রয়োজন অনুসারে পর্যায়ক্রমে এই মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়তে পারে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই সংসদ সদস্য এবং নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে বঙ্গভবনসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চলছে ব্যাপক তোড়জোড়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ের পর বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে গতরাতে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ছোট আকৃতির এই মন্ত্রিসভায় দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র নেতারা, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও সমমনা দলের প্রতিনিধি স্থান পেতে পারেন। এ ছাড়াও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসন জীবনে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে থাকা তাঁর সহকর্মীদের কেউ কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। তাছাড়া দলের ত্যাগী ও মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদেরও অনেকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন। আবার কয়েকজনকে মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা অথবা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। বিশ্বস্ত সূত্রমতে, আগামীকাল অথবা পরশুর মধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ এবং সোম কিংবা মঙ্গলবারের মধ্যে বঙ্গভবনে মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে পারে।